ইরানে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ব্যাপক সংঘর্ষ, নিহত ৬

বৃহস্পতিবার ইরানের তিনটি শহরে বিক্ষোভকারী এবং নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষে ছয়জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় কোণঠাসা হয়ে থাকা ইরানে চরম অর্থনৈতিক সংকট ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদে চলমান বিক্ষোভ সহিংসতায় রূপ নিয়েছে।

গত তিন বছরের মধ্যে দেশটিতে হওয়া সবচেয়ে বড় এ বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

এদিকে জনশৃঙ্খলায় বিঘ্ন সৃষ্টি এবং সরকারি সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির অভিযোগে ৩০ বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করেছে ইরান। গতকাল এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে তাসনিম নিউজ।

স্থানীয় সময় রবিবার তেহরানে বিক্ষোভ শুরু হয়। দোকানদাররা উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক স্থবিরতার বিরুদ্ধে ধর্মঘট শুরু করে এবং তারপর থেকে দেশের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে।কিছু বিক্ষোভে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির বিরুদ্ধে স্লোগান এবং ইরানি শাসনের উৎখাতের আহ্বান জানানো হয়।

আধা সরকারি সংবাদ সংস্থা ফারস নিউজ জানিয়েছে, গতকাল সন্ধ্যায় লোরেস্তান প্রদেশের একটি পুলিশ সদর দপ্তরে হামলার সময় অন্তত ৩ বিক্ষোভকারী নিহত এবং ১৭ জন আহত হয়েছেন। বিক্ষোভকারীরা সেখানে কয়েকটি পুলিশ ভ্যানে আগুন ধরিয়ে দেন। এ ছাড়া লোর্দেগান, কুহদাশত ও ইসফাহান প্রদেশেও মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

মানবাধিকার সংস্থা ‘হেনগাও’ দাবি করেছে, নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে বিক্ষোভকারীরা প্রাণ হারিয়েছেন। অন্যদিকে ইরানের বিপ্লবী গার্ডস বলেছে, কুহদাশতে বিক্ষোভকারীদের হামলায় তাদের আধা সামরিক বাহিনীর এক সদস্য নিহত হয়েছেন।

লোরেস্তান প্রদেশের ডেপুটি গভর্নর সাইদ পোরালির উদ্ধৃতি দিয়ে চ্যানেলটি জানিয়েছে, ‘গত রাতে কুহদাশত শহরের ২১ বছর বয়সী বাসিজের একজন সদস্য জনশৃঙ্খলা রক্ষার সময় দাঙ্গাবাজদের হাতে নিহত হয়েছেন।’  

‘বাসিজ’ হলো একটি স্বেচ্ছাসেবক আধাসামরিক বাহিনী, যেটি ইরানের ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর সঙ্গে যুক্ত। যাকে ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের আদর্শিক শাখা এবং পূর্বে কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভ দমন করার জন্য এটি ব্যবহার করছে।

পোরালি বলেছেন, ‘কুহদাশতের বিক্ষোভের সময় পাথর বিক্ষোভকারীরা পাথর নিক্ষেপ করায় ১৩ জন পুলিশ অফিসার এবং বাসিজ সদস্য আহত হয়েছেন।’

রাষ্ট্র-সংযুক্ত তাসনিম সংবাদ সংস্থা বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা পরিষেবাগুলোর সমন্বিত অভিযানে তেহরানের একটি জেলার ৩০ জনকে জনশৃঙ্খলা লঙ্ঘনের অভিযোগে গত রাতে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

এই বিক্ষোভগুলো ২০২২ সালের বড় আন্দোলনের মতো তীব্র নয়। ওই আন্দোলন শুরু হয়েছিল মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর। তিনি নারীদের পোশাকবিধি ভঙ্গের অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়ে হেফাজতে মারা যান। তার মৃত্যুর পর দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেক মানুষ নিহত হন। সাম্প্রতিক বিক্ষোভ প্রথমে শান্তিপূর্ণ ছিল। পরে অন্তত ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এতে যোগ দিলে আন্দোলন আরো ছড়িয়ে পড়ে।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান বিক্ষোভকারীদের কিছু দাবি ন্যায্য বলে স্বীকার করেছেন। তিনি দেশের খারাপ অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতির জন্য সরকারকে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে একই সঙ্গে সরকার কঠোর অবস্থানের কথাও জানিয়েছে। কিছু গণমাধ্যম বিক্ষোভের পেছনে অর্থনৈতিক সংকটকে দায়ী করছে, আবার কিছু গণমাধ্যম উসকানিদাতাদের কর্মকাণ্ডের কথা বলছে।

এদিকে ঠান্ডা আবহাওয়ায় জ্বালানি সাশ্রয়ের কথা বলে সরকার হঠাৎ করে বুধবার ব্যাংক ছুটি ঘোষণা করে। এর সঙ্গে বিক্ষোভের কোনো সম্পর্ক আছে কি না, তা সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বলেনি। ইরানের প্রসিকিউটর জেনারেল বলেছেন, শান্তিপূর্ণ অর্থনৈতিক প্রতিবাদ বৈধ। তবে কেউ অস্থিরতা সৃষ্টি করলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তাসনিম আরো জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপভিত্তিক সরকারবিরোধী গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত অভিযোগে সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভকে সহিংস করার চেষ্টা করার অভিযোগ রয়েছে। ইরানে দীর্ঘদিন ধরেই অর্থনৈতিক সংকট চলছে। গত এক বছরে দেশটির মুদ্রা রিয়ালের মূল্য ডলারের বিপরীতে এক-তৃতীয়াংশের বেশি কমে গেছে। ডিসেম্বর মাসে দেশটির বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৫২ শতাংশ।

Share With Your Friends

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *