গাজার দক্ষিণাঞ্চলের রাফা শহরে বিতর্কিত ত্রাণ সংস্থা জিএইচএফের একটি ত্রাণ বিতরণকেন্দ্রে জড়ো হওয়া অসহায় ও ক্ষুধার্ত ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্য করে মরিচের গুঁড়ার স্প্রে ছুড়েছে ইসরায়েলি সেনারা। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ২০ সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে এমন দৃশ্য দেখা যায়, যার সত্যতা নিশ্চিত করেছে আল–জাজিরার ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থা সানাদ।
ভিডিওটি ১০ জুলাই মুঠোফোনে ধারণ করা হয় এবং তা ২০ জুলাই রাতে সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। এতে দেখা যায়, তিনজন সশস্ত্র ইসরায়েলি সেনা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল-সমর্থিত ত্রাণ সংস্থা জিএইচএফের কেন্দ্রের আশপাশে জড়ো হওয়া জনতার ওপর মরিচের গুঁড়া ছুড়ে দিচ্ছেন। এই ঘটনা ঘটে রাফা শহরের শাকুশ এলাকায়। ভিডিওতে আরও দেখা যায়, পুরুষ, নারী ও শিশুরা ছুটে পালিয়ে যাচ্ছেন, অনেকে মুখ ঢেকে রেখেছেন, কেউ কেউ আতঙ্কে পিঠে ময়দার বস্তা নিয়ে দৌড়াচ্ছেন।
ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মে মাসের শেষ দিকে জিএইচএফ গাজায় কার্যক্রম শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত খাবারের খোঁজে গিয়ে অন্তত ৮৯১ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নিহতদের মধ্যে অন্তত ৬৭৪ জনই মারা গেছেন জিএইচএফের ত্রাণকেন্দ্রের আশপাশে।
গাজায় ইসরায়েলের দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা পূর্ণ অবরোধ কিছুটা শিথিল হওয়ার পর জিএইচএফ কার্যক্রম শুরু করে। তবে জাতিসংঘের নেতৃত্বাধীন বৃহৎ ত্রাণ নেটওয়ার্ককে উপেক্ষা করে পরিচালিত এই সংস্থার বিতরণব্যবস্থাকে ঘিরে বিতর্ক চলছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বিতরণব্যবস্থা স্বচ্ছ নয় এবং ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য এতে যুক্ত রয়েছে।
গতকাল রোববার গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর পৃথক হামলায় আরও ৮৪ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৭৩ জনই ছিলেন ত্রাণ সংগ্রহে আসা সাধারণ মানুষ। গাজার বাসিন্দা মাহমুদ মোকাইমার জানান, তিনিও অন্যদের সঙ্গে ত্রাণকেন্দ্রে যাচ্ছিলেন, তখন ইসরায়েলি সেনারা প্রথমে সতর্কতামূলক গুলি চালায়, পরে সরাসরি গুলিবর্ষণ করে। তিনি বলেন, ‘দখলদার বাহিনী আমাদের ওপর এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। আমি অন্তত তিনজনকে মাটিতে নিথর পড়ে থাকতে দেখি।’
আল–জাজিরার গাজা প্রতিনিধির ভাষ্যমতে, খাদ্যের সন্ধানে ফিলিস্তিনিদের জীবন ঝুঁকিতে পড়েছে। এক মা–বাবা জানেন, গুলি খাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, তবু শিশুদের মুখে একমুঠো খাবার তুলে দিতে জীবন বাজি রেখে ত্রাণকেন্দ্রে ছুটছেন।
এদিকে অপুষ্টি ও অনাহারে শিশুদের মৃত্যুর ঘটনা বাড়ছে। গাজার আল-আকসা মারটায়ার হাসপাতালের সূত্র জানায়, চার বছর বয়সী রাজান আবু জাহের অপুষ্টিতে মারা গেছে। শনিবার আল-শিফা হাসপাতালের পরিচালক জানান, সেখানে ৩৫ দিন বয়সী এক নবজাতকসহ আরও দুজন অনাহারে প্রাণ হারিয়েছেন।
অবস্থা দিন দিন ভয়াবহ হচ্ছে। জাতিসংঘ সতর্ক করেছে, যদি ইসরায়েল গাজায় খাদ্য প্রবেশে বাধা দিয়ে যায়, তবে সামনে আরও ভয়ংকর মানবিক বিপর্যয় আসবে।