ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবির–সমর্থিত প্যানেলের বিজয়ী নেতাদের নিয়ে নতুন রাজনৈতিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে তাঁদের এক অভিনব পদক্ষেপ। গত বৃহস্পতিবার সকালে তাঁরা রায়েরবাজার শহীদ বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধে গিয়ে দোয়া ও মোনাজাত করেছেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে জামায়াত-সমর্থিত কোনো সংগঠনের এ ধরনের কার্যক্রম এটাই প্রথম। ফলে একাত্তরে জামায়াতে ইসলামীর স্বাধীনতাবিরোধী অবস্থানের পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে এটিকে দেখা হচ্ছে। দলীয় সূত্র বলছে, ভবিষ্যতে এ ধরনের উদ্যোগ আরও নেওয়া হতে পারে, যা এত দিন জামায়াত করেনি।
জামায়াতের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের সময়কার অবস্থানের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা ও ভুল স্বীকারের বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের মধ্যে আগের তুলনায় ইতিবাচক আলোচনা হচ্ছে। তবে এখনো দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী সংস্থা কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। অনুকূল পরিবেশ ও প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আনা হতে পারে। এর আগে জামায়াতের দুই সাবেক নেতা মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ও ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক দলের অবস্থান পরিবর্তনের জন্য প্রকাশ্যে মত দিয়েছিলেন। রাজ্জাক ২০১৯ সালে দল থেকে পদত্যাগ করেন এবং কামারুজ্জামান যুদ্ধাপরাধের দায়ে ফাঁসিতে দণ্ডিত হন। দুজনই তাঁদের বক্তব্যে দলের জন্য সংস্কার ও ভবিষ্যতের নতুন কৌশলের পরামর্শ দিয়েছিলেন।
ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের পদত্যাগপত্রে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল যে, জামায়াতকে অতীতের রাজনৈতিক ভুলের জন্য ক্ষমা চাইতে হবে এবং নতুন নামে পুনর্গঠিত হতে হবে। তিনি মনে করেছিলেন, এটি হলে একটি ঐতিহাসিক অর্জন হবে। কিন্তু দলের শীর্ষ নেতৃত্ব তাঁর প্রস্তাবে রাজি হয়নি। একইভাবে কামারুজ্জামান কারাগার থেকে লেখা চিঠিতে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত নেতাদের নেতৃত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন এবং নতুন প্রজন্মের হাতে জামায়াতকে তুলে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন।
অন্যদিকে, জামায়াত থেকে বেরিয়ে যাওয়া আরেক নেতা মজিবুর রহমান মঞ্জু ২০২০ সালে ‘আমার বাংলাদেশ পার্টি’ (এবি পার্টি) গঠন করেন। তিনিও দাবি করেছিলেন, জামায়াত বাস্তবসম্মত সংস্কার ও মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকার জন্য ক্ষমা না চাওয়ায় তিনি নতুন পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন। এসব উদাহরণ প্রমাণ করে, জামায়াতের ভেতর থেকে দীর্ঘদিন ধরেই পরিবর্তনের দাবি ছিল, যদিও দলীয় সিদ্ধান্তে তা প্রতিফলিত হয়নি।
তবে সাম্প্রতিক ডাকসু নির্বাচনের ফলাফল এবং শিবির নেতাদের রায়েরবাজার শহীদ বধ্যভূমিতে উপস্থিতি পরিস্থিতিকে নতুন দিকে নিয়ে যাচ্ছে। নির্বাচনে বিজয়ের পর মো. আবু সাদিক কায়েম (ভিপি), এস এম ফরহাদ (জিএস) ও মুহাম্মদ মহিউদ্দীন খান (এজিএস)সহ শিবির-সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটের নেতারা কবর জিয়ারত করেন এবং শহীদদের স্মরণে দোয়া-মোনাজাত করেন। তাঁদের বক্তব্যে উঠে আসে, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও দেশের গঠনে শহীদদের অবদানকে তাঁরা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছেন।
জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, স্বাধীনতাযুদ্ধে ও পরবর্তী সময়ে দেশের গঠন ও বিনির্মাণে যাঁদের অবদান আছে, তাঁদের সম্মান জানানোই ছিল এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য। তিনি দাবি করেন, এটা দলীয় সিদ্ধান্তে করা হয়েছে। এ বক্তব্যকে রাজনৈতিক মহল ভিন্নভাবে বিশ্লেষণ করছে। অনেকে মনে করছেন, জামায়াত দীর্ঘদিন পর হলেও এখন ধীরে ধীরে নতুন বাস্তবতা মেনে নেওয়ার পথে হাঁটছে।
দলীয় সংস্কারের দিক থেকেও কিছু পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। এখন পর্যন্ত জাতীয় নির্বাচনে শুধু রুকন বা শপথধারী সদস্যদের মনোনয়ন দেওয়া হলেও, আগামীতে এ শর্ত শিথিল করার চিন্তা চলছে। যোগ্য ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের প্রার্থিতা দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা আছে। এমনকি অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতিও নীতি আরও উদার করার কথা ভাবা হচ্ছে।
এছাড়া ডাকসু নির্বাচনের সময় শিবির ও ছাত্রী সংস্থার মধ্যে নির্বাচনী সমন্বয় করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এটি অতীতে দেখা যায়নি। গঠনতান্ত্রিকভাবে ইসলামী ছাত্রী সংস্থা জামায়াতের মহিলা বিভাগের অধীন এবং আলাদা সাংগঠনিক কাঠামোয় পরিচালিত হয়। কিন্তু এবার ছাত্রশিবিরের প্রার্থীদের অনুরোধে দল ছাত্রী সংস্থার সঙ্গে প্রচার কার্যক্রমে যৌথ সমন্বয়ের সুযোগ দেয়। এটি দলীয় নীতিতে এক ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, শিবির নেতাদের বধ্যভূমিতে যাওয়া এবং দলীয়ভাবে শহীদদের সম্মান জানানো জামায়াতের পুরোনো অবস্থান থেকে সরে আসার এক গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হতে পারে। যদিও এখনো প্রকাশ্যে ক্ষমা প্রার্থনা কিংবা রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের বিষয়ে নিশ্চিত ঘোষণা আসেনি, তবে সাম্প্রতিক কার্যক্রমগুলো দলটির অভ্যন্তরে পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে।
সব মিলিয়ে ডাকসু নির্বাচনের পর শিবির নেতাদের শহীদ বধ্যভূমিতে উপস্থিতি শুধু একটি প্রতীকী পদক্ষেপ নয়, বরং জামায়াতের দীর্ঘদিনের বিতর্কিত অবস্থানের পরিবর্তনের সম্ভাব্য সূচনা। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এটি নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে এবং আগামী দিনে এ ইস্যু দলটির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।