ভারতে হিন্দি ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার উদ্যোগে বাড়ছে বিতর্ক, দক্ষিণে সাংস্কৃতিক টানাপোড়েন

ভারতের ভাষাগত বৈচিত্র্য দেশটির অন্যতম শক্তি হলেও, হিন্দি ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার অভিযোগ ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা ও বিরোধ দিন দিন বাড়ছে। নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার দেশজুড়ে ধীরে ধীরে হিন্দি ভাষার প্রসার ঘটাচ্ছে, যার ফলে বিশেষ করে দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলোতে দেখা দিয়েছে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া।

সম্প্রতি মহারাষ্ট্র রাজ্যে হিন্দি ভাষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নেয় বিজেপি সরকার। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফাডনবিশ গত এপ্রিল মাসে এক অধ্যাদেশ জারি করে জানান, প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ইংরেজি ও মারাঠির পাশাপাশি হিন্দিও পড়াতে হবে। এই সিদ্ধান্তকে স্থানীয় মারাঠি ভাষার ওপর হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখেন রাজনীতিক ও সাধারণ মানুষ। ব্যাপক প্রতিবাদের মুখে পরে রাজ্য সরকার সেই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়।

দক্ষিণের রাজ্য তামিলনাড়ুতেও পরিস্থিতি ভিন্ন নয়। রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্টালিন কেন্দ্রীয় সরকারের শিক্ষানীতির বিরোধিতা করে বলেন, “তামিলনাড়ুতে হিন্দি ভাষার কোনো প্রয়োজন নেই। আমাদের তামিল ও ইংরেজির মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা উচ্চ সাক্ষরতার হার অর্জন করেছে।” তিনি আরও জানান, শিক্ষার্থীদের ওপর জোর করে হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা মানা যায় না।

২০২০ সালে মোদি সরকার ভারতের বহু পুরনো শিক্ষানীতি বদলে নতুন জাতীয় শিক্ষানীতি চালু করে। তাতে বলা হয়, স্কুলে তিনটি ভাষা শেখানো বাধ্যতামূলক, যার মধ্যে অন্তত দুটি ভাষা হতে হবে ভারতের নিজস্ব ভাষা। যদিও রাজ্যগুলোকে ভাষা বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়, তবুও অনেকেই মনে করেন, এর মাধ্যমে পরোক্ষভাবে হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

তামিলনাড়ু ইতিমধ্যেই কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে আদালতে গেছে, কারণ কেন্দ্রীয় সরকার হুমকি দিয়েছিল, জাতীয় শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন না করলে শিক্ষা খাতে রাজ্যটিকে বরাদ্দ দেওয়া হবে না।

এই প্রেক্ষাপটে অধিকাংশ ভাষাবিদ ও অধিকারকর্মীরাও উদ্বিগ্ন। শিশুদের ভাষাভিত্তিক বিকাশ নিয়ে কাজ করা নিরঞ্জনা রাধ্য ভি পি বলেন, “যেকোনো একটি ভাষা চাপিয়ে দিলে ভারতের জাতীয় ঐক্য ও সংহতি হুমকির মুখে পড়বে।”

মারাঠি ভাষা নিয়েও সম্প্রতি রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বিবাদে থাকা চাচাতো ভাই রাজ ঠাকরে ও উদ্ধব ঠাকরে হিন্দি ভাষা বিরোধী আন্দোলনে একত্র হন। রাজ ঠাকরে বলেন, “মারাঠি ভাষার স্বার্থে আমরা দলীয় বিভেদ ভুলেছি।” উদ্ধব ঠাকরে যোগ করেন, “আমরা এক হয়েছি, একসঙ্গেই থাকব।”

এদিকে, ‘দ্য তামিলস: আ পোর্ট্রেট অব আ কমিউনিটি’ বইয়ের লেখক নির্মলা লক্ষ্মণ বলেন, “তামিলরা তাঁদের ভাষা নিয়ে গর্বিত। হিন্দি ভাষা চাপিয়ে দেওয়া হলে এই সংস্কৃতি বিলুপ্তির মুখে পড়বে।”

ভারতের সরকারি ভাষা হিন্দি ও ইংরেজি হলেও, সংবিধানে স্বীকৃত ২২টি ভাষা রয়েছে। কিন্তু মোদি সরকারের ‘এক ভাষা, এক জাতি’ নীতিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বাড়ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ভাষানীতির মাধ্যমে বিজেপি হিন্দুত্ববাদী ভারত গঠনের স্বপ্ন দেখছে।

যদিও প্রধানমন্ত্রী মোদি ও তাঁর দল ভাষাগত বৈচিত্র্যের প্রশংসা করে থাকেন, বাস্তবে তাঁদের নীতিগত সিদ্ধান্তগুলো একক ভাষার আধিপত্য প্রতিষ্ঠার দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে বলে মত দিয়েছেন অনেকে। ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতীয় ঐক্যের ভারসাম্য বজায় রাখা এখন ভারতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

Share With Your Friends

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *