চলচ্চিত্র অঙ্গনে বয়স একটি স্পর্শকাতর বিষয়—বিশেষ করে নায়িকাদের ক্ষেত্রে। অনেক গোপন কথা প্রকাশ করলেও বয়স প্রকাশে নারাজ থাকেন অধিকাংশ অভিনেত্রী। সাংবাদিকরা জানতে চাইলে কেউ কৌশলী উত্তর দেন, কেউ বিরক্ত হন, আবার কেউ বিষয়টি এড়িয়ে যান। প্রশ্ন উঠছে—একজন নায়িকা হিসেবে আসলে কত বছর বয়স পর্যন্ত কাজ করা যায়?
খোদ চলচ্চিত্র নির্মাতাদের একটি বড় অংশ মনে করেন, বর্তমান সময়ে ৩৫ বছরের বেশি বয়সী নায়িকাকে দর্শক গ্রহণ করতে চায় না। যদিও বাস্তবতা বলছে, এই ধারণা ক্রমেই প্রশ্নের মুখে পড়ছে। কারণ বয়সের গণ্ডি পেরিয়েও অনেক অভিনেত্রী নিয়মিত কাজ করছেন এবং জনপ্রিয়তাও ধরে রেখেছেন।
বর্তমানে উইকিপিডিয়ায় সার্চ দিলে প্রায় সব নায়িকার জন্মসাল পাওয়া যায়। কিন্তু সেই তথ্য যে পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্য, তা মানতে নারাজ সাধারণ দর্শক থেকে শুরু করে চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট অনেকেই। প্রচলিত প্রবাদ আছে—“মেয়েরা কখনো তাদের আসল বয়স বলে না।” আরেকটি প্রবাদ হলো—মেয়েদের বয়স জানতে চাওয়া অভদ্রতা। এই সামাজিক ধারণাগুলোর সুযোগ নিয়েই বয়স নিয়ে লুকোচুরি চলে বলে মনে করেন অনেকে।
ঢালিউড ও টালিউডে বয়স বিতর্কে সবচেয়ে বেশি আলোচিত নাম জয়া আহসান। দুই বাংলার জনপ্রিয় এই অভিনেত্রীর বয়স নিয়ে বছরের পর বছর ধরে অনুসন্ধান চালিয়েছে গণমাধ্যম। তবে আজও তার প্রকৃত বয়স নিয়ে নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি। সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলেই জয়া প্রায়ই বলেন, “বয়স তো শুধু একটা সংখ্যা।”
একসময় উইকিপিডিয়ায় উল্লেখ ছিল, জয়ার জন্ম ১৯৭২ সালের ১ জুলাই। পরে তিনি নিজেই জানান, তথ্যটি ভুল। তার দাবি অনুযায়ী জন্ম সাল ১৯৮৩। আবার ২০১৯ সালের এক সাক্ষাৎকারে জয়া বলেন, তার বয়স “৩৭ বছরের একদিনও বেশি নয়।” সে হিসাবে বর্তমানে তার বয়স দাঁড়ায় ৪৬ কিংবা ৪৭।
সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া জয়ার বিবাহ-পূর্ব একটি সাদা-কালো ছবি নতুন করে বিতর্ক উসকে দেয়। ছবিতে জয়া মাসউদ নামের পরিচয়ে তাকে দেখা যায়, যা তার প্রথম স্বামীর পদবি। ছবিটি ১৯৯৮ সালের আগের সময়ের বলে ধারণা করা হচ্ছে। সেই সময় জয়া জানিয়েছিলেন, তার বয়স ২০। কিন্তু নেটিজেনদের একাংশের দাবি, সেই হিসাবে বয়স মিলছে না। কেউ কেউ মন্তব্য করেন, তাহলে কি তিনি মাত্র ১৫ বছর বয়সে বিয়ে করেছিলেন? বিষয়টি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে শুরু হয় তর্ক-বিতর্ক।
তবে সমালোচনার পাশাপাশি অনেকেই জয়ার পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাদের মতে, বয়স নয়—একজন শিল্পীর পরিচয় হওয়া উচিত তার কাজ দিয়ে। জয়া নিজেও একাধিকবার বলেছেন, বয়স নয়, কাজই হওয়া উচিত শিল্পীর প্রকৃত পরিচয়। অভিনয় দক্ষতা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি সেই কথার প্রমাণও দিয়েছেন।
বয়স নিয়ে ব্যতিক্রমী অবস্থানে আছেন ঢালিউডের জনপ্রিয় অভিনেত্রী মৌসুমী। তিনি প্রকাশ্যেই নিজের বয়স জানিয়েছেন এবং বিষয়টি নিয়ে কোনো রাখঢাক করেন না। ১৯৭৩ সালের ৩ নভেম্বর জন্ম নেওয়া মৌসুমীর বর্তমান বয়স প্রায় ৫২ বছর। মাত্র ২০ বছর বয়সে চলচ্চিত্রে যাত্রা শুরু করা এই অভিনেত্রী আজও দর্শকের কাছে সম্মানিত নাম।
এছাড়া উইকিপিডিয়া সূত্রে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়—বিদ্যা সিনহা মিমের বয়স ৩৪, আজমেরী হক বাঁধনের ৪৩, অপু বিশ্বাসের ৩৭, মিথিলার ৪৬, তমা মির্জার ৪১, তাসনিয়া ফারিনের ৩২, মেহজাবীনের ৩৫, তানজিন তিশার ৩৩, পূজা চেরীর ২৬, শবনম বুবলীর ৩৮, নুসরাত ফারিয়ার ৩৩, পরীমণির ৩৪ বছর।
এই তালিকা প্রমাণ করে, চলচ্চিত্রকারদের তথাকথিত ৩৫ বছরের বয়সসীমা বহু অভিনেত্রী আগেই অতিক্রম করলেও তারা জনপ্রিয়তা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। প্রশ্ন থেকে যায়—তাহলে কি বয়স আসলেই বাধা, নাকি এটি কেবল ইন্ডাস্ট্রির পুরোনো মানসিকতা?
বয়স নিয়ে এই লুকোচুরি যতদিন থাকবে, ততদিন নায়িকাদের প্রকৃত বয়স হয়তো আড়ালেই থেকে যাবে। তবে একথা অস্বীকার করার উপায় নেই—আজকের দিনে দর্শক ক্রমেই কাজ ও অভিনয়কে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে, বয়সকে নয়।