ভারতের কার্পেটশিল্প চরম সংকটে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ মাত্রার শুল্ক আরোপের কারণে। দীর্ঘদিন ধরে যেসব রপ্তানিকারক যুক্তরাষ্ট্রকে প্রধান বাজার হিসেবে ধরে রেখেছিলেন, তাঁরা এখন ব্যবসা প্রায় বন্ধ হওয়ার মুখে। উত্তর প্রদেশের ভাদোহিকে বলা হয় ভারতের ‘কার্পেট সিটি’। এখানকার হাজারো রপ্তানিকারক ও লাখো তাঁতির জীবিকা পুরোপুরি নির্ভর করে মার্কিন বাজারের ওপর। কিন্তু সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণায় সব হিসাব উল্টে গেছে।
ভাদোহির অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী সূর্যমণি তিওয়ারি ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কার্পেট রপ্তানির সঙ্গে জড়িত। প্রতিবছর প্রায় ১০০ কোটি রুপির সমমূল্যের কার্পেট তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পাঠাতেন। কিন্তু ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের পর তাঁর ব্যবসা কার্যত থেমে গেছে। এক মাসেরও বেশি সময় ধরে কোনো চালান পাঠানো সম্ভব হয়নি। তিনি হতাশ কণ্ঠে বলেছেন, যদি দ্রুত সমাধান না আসে, পুরো শিল্প ভয়ানক বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।
প্রথম ধাক্কা আসে ৭ আগস্ট, যখন হঠাৎ করেই ২৫ শতাংশ শুল্ক ঘোষণা করা হয়। এর কয়েক সপ্তাহ পর, ২৭ আগস্ট, রাশিয়ার কাছ থেকে ভারত তেল আমদানি করছে—এই অভিযোগে আরও ২৫ শতাংশ শুল্ক যোগ করে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের মতে, মস্কো থেকে তেল কিনে ভারত ইউক্রেন যুদ্ধকে পরোক্ষভাবে উসকে দিচ্ছে। ফলে ভারতের কার্পেট রপ্তানি এখন একেবারে অচলাবস্থায়।
হাতে বোনা, হস্তশিল্পনির্ভর পারস্য ধাঁচের কার্পেট যুক্তরাষ্ট্রে অত্যন্ত জনপ্রিয়। ভারতীয় কার্পেটশিল্পের বার্ষিক আয় প্রায় ১৬ হাজার কোটি রুপি, যেখানে কর্মরত প্রায় ২৫ লাখ মানুষ। তাঁদের মধ্যে অধিকাংশই তাঁতি, যারা গ্রামে বসেই কাজ করেন। শিল্পটির ৮০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে ভাদোহি। প্রায় ১ হাজার ২০০ রপ্তানিকারক ও প্রস্তুতকারকের সঙ্গে এখানে ১৪ লাখ মানুষের জীবিকা জড়িয়ে আছে। হঠাৎ শুল্ক বৃদ্ধির ধাক্কা তাই এই অঞ্চলের অর্থনীতিকে পুরোপুরি নাড়িয়ে দিয়েছে।
কার্পেট রপ্তানি উন্নয়ন কাউন্সিলের পরিচালক পিয়ুষ বারনওয়াল সরাসরি বলেছেন, এত বেশি শুল্ক শিল্পকে ধ্বংস করে দিয়েছে। স্থানীয় বাজার খুবই সীমিত, ফলে রপ্তানি ছাড়া বিকল্প নেই। আর যুক্তরাষ্ট্রই এককভাবে ভারতের রপ্তানির প্রায় ৬০ শতাংশ শোষণ করে। তিনি জানান, এত বেশি শুল্ক দিয়ে ব্যবসা চালানো অসম্ভব, কারণ পাইকারি বাজারে লাভ থাকে মাত্র ৮ থেকে ১০ শতাংশ। এ অবস্থায় শিল্প মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া ছাড়া আর কিছু নয়।
রপ্তানিকারক সঞ্জয় গুপ্তা জানিয়েছেন, কার্পেটশিল্প কুটিরশিল্পের মতো কাজ করে। অসংখ্য তাঁতি বাড়ি থেকে বসে কাজ করেন। শুল্ক বাড়ায় ইতিমধ্যেই ব্যবসা ৪০ শতাংশ কমে গেছে। অনেক তাঁতি কাজ হারিয়ে অন্য রাজ্যে চলে যাচ্ছেন। একবার তাঁতিরা পেশা ছেড়ে দিলে তাঁদের ফিরিয়ে আনা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।
রপ্তানিকারকদের আরেক ভয় হলো, বাজার হারিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো লাভবান হবে। তুরস্ক ও পাকিস্তান অনেক কম শুল্কে (ক্রমশ ১৫ ও ১৯ শতাংশ) মার্কিন বাজারে প্রবেশ করছে। মোহাম্মদ জাকির হোসেন সতর্ক করেছেন, দ্রুত সমাধান না হলে ভারতীয় কার্পেট বাজারের বড় অংশ হারাতে পারে।
মধ্যস্বত্বভোগী ও সরবরাহকারীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। মোহাম্মদ জামির আহমেদ তুলা ও সুতা সরবরাহ করতেন। তিনি জানালেন, ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ায় তাঁর ব্যবসাও কার্যত বন্ধ। অন্যদিকে কার্পেট প্রস্তুতকারক ইমতিয়াজ আনসারি জানান, কাজ না থাকায় তাঁরা কর্মীদের সপ্তাহে মাত্র তিন দিন কাজ দিচ্ছেন। প্রায় ৯০ শতাংশ অর্ডার বাতিল হয়ে গেছে।
শিল্পের এই ধ্বস কর্মসংস্থানেও বড় আঘাত হেনেছে। অল ইন্ডিয়া কার্পেট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি রাজা খান জানিয়েছেন, ইতিমধ্যে এক লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছেন। যদি পরিস্থিতি দুই মাসের মধ্যে না বদলায়, বেকারের সংখ্যা সাত লাখ ছাড়িয়ে যাবে। ভাদোহির তাঁতিদের মধ্যে অনেকেই ইতিমধ্যেই অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন।
দুর্দশার কাহিনি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন দেখা যায়, ফাতিমা সামির নামের এক মহিলা তাঁতি এখন আর সন্তানের স্কুলে খরচ চালাতে পারছেন না। ঘণ্টায় ৬০ রুপি আয় কমে যাওয়ায় তাঁর ছোট মেয়েকে পড়াশোনা বন্ধ করতে হয়েছে। স্বামী অন্য শহরে গিয়ে কোমল পানীয় কারখানায় শ্রমিকের কাজ নিয়েছেন।
স্থানীয় সাংবাদিকরা বলছেন, শুধু শিল্পই নয়, পুরো শহরের অর্থনীতিই ভেঙে পড়বে। কারখানাগুলো সাধারণত ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে কার্পেট তৈরি করে। কিন্তু ক্রয়াদেশ না থাকায় সেই ঋণ শোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে শহরের আর্থিক প্রবাহ থমকে গেছে।
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কবৃদ্ধি শুধু একটি রপ্তানি খাত নয়, লাখো মানুষের জীবনযাত্রা, শহরের অর্থনীতি এবং ভারতের এক ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্পকে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিয়েছে। যদি দ্রুত কোনো সমাধান না আসে, ভারতের কার্পেটশিল্প হয়তো আর আগের জায়গায় ফিরে যেতে পারবে না।