দশ বছর পর চবি প্রশাসনের অভিযান, দুই ফ্ল্যাট উদ্ধার, ছাত্রলীগের দখলদারিত্বের কলঙ্ক উন্মোচিত

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) দক্ষিণ ক্যাম্পাসের মিনহাজ ভবনে দীর্ঘ ১০ বছর ধরে দখলকৃত দুইটি ফ্ল্যাট উদ্ধার করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। শুক্রবার (২৫ এপ্রিল) দুপুরে চবি প্রক্টরিয়াল বডি এবং স্টেট শাখার যৌথ অভিযানে এই ফ্ল্যাটগুলো পুনর্দখল করা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর মো. নুরুল হামিদ কানন বলেন,

“ভবনের ৫ম তলায় অবস্থিত দুইটি অ্যাপার্টমেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পত্তি। অথচ ২০১৬ সাল থেকে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা এগুলো অবৈধভাবে দখল করে রেখেছিল। আজ দশ বছর পর অবশেষে সেগুলো উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।”

প্রক্টর অধ্যাপক ড. তানভীর মোহাম্মদ হায়দার আরিফ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,

“লুটপাটের কোন পর্যায়ে গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুষ্ট লোকজন এবং লুটপাটকারী নেতারা মিলে এতবড় দুঃসাহস দেখাতে পারে! শুধু দখল নয়, এসব ফ্ল্যাট ভাড়া দিয়ে নিয়মিত অর্থ উপার্জনও করে যাচ্ছিল তারা। অবশেষে প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপে দুটি ফ্ল্যাট উদ্ধার হয়েছে। তবে এখনও অনেকের এসব উদ্যোগ পছন্দ হচ্ছে না।”

বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, এক সময়ের ঐতিহ্যবাহী ছাত্রসংগঠন, বিগত এক দশকের বেশি সময় ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় দখলদারিত্ব, টেন্ডারবাজি, অস্ত্রবাজি এবং শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ ধ্বংসের অন্যতম প্রতীক । চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্ল্যাট দখলের এই ঘটনা তারই একটি নগ্ন উদাহরণ।

২০১৬ সাল থেকে চবি ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের একাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পদ দখল করে নিজেরা বসবাস করতো বা ভাড়া দিয়ে অবৈধভাবে অর্থ উপার্জন করতো। প্রশাসন বারবার নীরব দর্শক ছিল। কারণ, এদের পেছনে ছিল সরকারের উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া। ফলস্বরূপ, দুর্নীতি, দখল, সন্ত্রাস চবির স্বাভাবিক শিক্ষাব্যবস্থাকে বারবার বিঘ্নিত করেছে।

৫ই আগস্ট, দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ দিন। দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার এই দিনে পতনের মুখে পড়ে। বছরের পর বছর ধরে সুশাসনের অভাব, দুর্নীতি, গুম-খুন এবং ছাত্রলীগের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ জমে ওঠে। অবশেষে গণআন্দোলন ও আন্তর্জাতিক চাপের সম্মিলিত প্রভাবের ফলে ৫ আগস্ট সরকার পদত্যাগে বাধ্য হয়। এই দিনটি দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রতীক।

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরে ছাত্রলীগ নিষিদ্ধ করা হয়। সম্প্রতি বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকারের পতন এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে ছাত্রলীগের ভবিষ্যৎ নিয়েও ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। সরকার পতনের পর ছাত্রলীগের প্রতি জনমনে জমে থাকা ক্ষোভ আরও প্রবল হয়ে উঠেছে। সাধারণ ছাত্রছাত্রী ও নাগরিকরা এখন সরাসরি প্রশ্ন তুলছেন—

“আওয়ামী লীগ দেশে কেন থাকবে?”

ছাত্রলীগের অপকর্মগুলো হল :

  • শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দখলদারিত্ব
  • সহিংসতা ও অপশাসন
  • রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় অপরাধমূলক কার্যক্রম
  • শিক্ষা ও সংস্কৃতির পরিবেশ ধ্বংস

বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারের পতনের পরে দেশে যে নতুন রাজনৈতিক ধারা সূচিত হচ্ছে, তাতে ছাত্রসংগঠনের ভূমিকা সম্পূর্ণ বদলে যাবে। আর অপরাধী ছাত্রসংগঠনগুলোর বিলুপ্তি বা কঠোর সংস্কার অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দুইটি ফ্ল্যাট উদ্ধার ঘটনা নিছক কোনো সাধারণ প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়; এটি বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনে চলমান অপরাধ-দখল-লুটপাটের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী বার্তা। এটি ছাত্রলীগের পতনের প্রতীক হিসেবেও দেখা যেতে পারে।

আজ যখন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সাহসিকতার সাথে অপদখলমুক্ত করার অভিযান পরিচালনা করছে, তখন সারা দেশের শিক্ষার্থীসমাজ ও সাধারণ জনগণের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হচ্ছে। শিক্ষাঙ্গনগুলো ফিরে পাবে তাদের আসল চরিত্র—একটি মুক্ত, নিরাপদ, শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ।

Share With Your Friends

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *