চট্টগ্রাম নগরের ব্যস্ততম মোড়গুলোর একটি ২ নম্বর গেট। প্রতিদিন হাজারো মানুষ এই মোড় দিয়ে চলাচল করেন। কিন্তু এখানে ছোট-বড় অসংখ্য গর্ত এখন দুর্ঘটনার ফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি এক রিকশাচালক মোহাম্মদ হোসেনের রিকশা এমন এক গর্তে পড়েই প্রায় উল্টে যাচ্ছিল। কোনোরকমে সামলে নেওয়ার পর তিনি ক্ষোভ ঝেড়ে বলেন, “রাস্তায় খালি গর্ত আর গর্ত। গর্তের যন্ত্রণায় গাড়ি চালাতে পারি না। ইট দিয়ে ভরাট করলেও তা টেকে না, বৃষ্টি হলেই আবার ভাঙে। বছরের পর বছর এভাবেই চলতে দেখি।”
এ দৃশ্য কেবল ২ নম্বর গেটের নয়, বর্ষা নামলেই চট্টগ্রাম নগরের প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলি একই পরিস্থিতির শিকার হয়। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বর্ষায় নগরের ৩৮৮টি সড়ক ভেঙেছে। ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের দৈর্ঘ্য ১৪২ কিলোমিটার, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এসব সড়ক মেরামতে করপোরেশনের প্রয়োজন হবে প্রায় ৪২০ কোটি টাকা।
রাস্তাঘাট ভাঙার মূল কারণ
চসিকের প্রকৌশলীদের মতে, দুটি প্রধান কারণে নগরের রাস্তাঘাট প্রতিবছর বর্ষায় ভয়াবহভাবে নষ্ট হয়। প্রথমত, ভারী বর্ষণে সড়কে পানি জমে যায়, যা বিটুমিনের শত্রু। পানি জমলে বিটুমিন ক্ষয় হয়ে খানাখন্দ সৃষ্টি করে। দ্বিতীয়ত, সড়কগুলো মূলত ১০ থেকে ২০ টন ওজনের গাড়ি বহনের উপযোগী করে নির্মিত। অথচ বন্দরের কারণে প্রতিদিন ৫০ থেকে ৬০ টনের মালবাহী গাড়ি এসব সড়কে চলে। ফলে সড়ক দ্রুত ভেঙে যায়।
তবে প্রকৌশলীদের এ ব্যাখ্যার বাইরে বিশেষজ্ঞরা সংস্কারের গুণগত মান নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন। চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক স্বপন কুমার পালিত বলেন, “একটি সড়ক পরিকল্পিতভাবে করা হলে অন্তত ১০ থেকে ১৫ বছর টিকে থাকার কথা। কিন্তু চট্টগ্রাম নগরের ড্রেনেজব্যবস্থা দুর্বল, ফলে অনেক সময় সড়ক পানিতে ডুবে থাকে। তার সঙ্গে মানসম্পন্ন উপকরণ ব্যবহার না করা, ঠিকাদারদের তদারকির অভাব ইত্যাদি কারণে রাস্তা অল্প সময়েই বেহাল হয়ে পড়ে।”
গত পাঁচ বছরের চিত্র
তথ্য বলছে, গত পাঁচ বছরে কখনো এত সড়ক একসঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। ২০২1 সালে ভেঙেছিল ৩৬ কিলোমিটার সড়ক, ২০২২ সালে ১০০ কিলোমিটার, ২০২৩ সালে ৫০ কিলোমিটার এবং ২০২৪ সালে ১০০ কিলোমিটার রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু চলতি বছর এক লাফে ১৪২ কিলোমিটার সড়ক নষ্ট হয়েছে।
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা
এবার সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে দক্ষিণ আগ্রাবাদ ওয়ার্ডে, যেখানে একাই ৫৫টি রাস্তা ভেঙেছে। আগ্রাবাদের সিডিএ আবাসিক এলাকায় প্রায় সব সড়কই এখন ক্ষতবিক্ষত। পয়োনিষ্কাশন প্রকল্পের জন্য চলমান খোঁড়াখুঁড়ি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
দ্বিতীয় সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত শুলকবহর ওয়ার্ডে ৩১টি রাস্তা ভেঙেছে। চান্দগাঁও ওয়ার্ডে ২১টি, উত্তর আগ্রাবাদে ২০, পাঁচলাইশে ১৮, উত্তর কাট্টলীতে ১৯, পশ্চিম ষোলশহরে ১৪, লালখান বাজারে ১৩, দক্ষিণ হালিশহরে ১৩, দক্ষিণ মধ্যম হালিশহরে ১২ এবং উত্তর পতেঙ্গায় ১০টি সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
নগরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোর অবস্থা
সরেজমিনে দেখা গেছে, বায়েজিদ বোস্তামী সড়কের ২ নম্বর গেট থেকে অক্সিজেনমুখী অংশে খানাখন্দ ভরাট ও কার্পেটিংয়ের কাজ চলছে। তবে অক্সিজেন থেকে ২ নম্বর গেটমুখী অংশে বড় বড় গর্তে গাড়ি চলাচল দুরূহ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে উড়ালসড়কের র্যাম্পের নিচে বেবি সুপারমার্কেট এলাকায় পরিস্থিতি ভয়াবহ।
সিডিএ অ্যাভিনিউর ২ নম্বর গেট মোড়ের আশপাশেও পিচ উঠে গিয়ে গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। সিআরবি এলাকার সড়কগুলোও একই চিত্র। স্ট্র্যান্ড রোডের অবস্থা আরও খারাপ; বড় গর্তগুলোতে পানি জমে রয়েছে। স্থানীয় অটোরিকশাচালক আবদুল হালিম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এটা সড়ক নয়, যেন পুকুর। এত বড় গর্তে গাড়ি পড়লে তো উল্টেই যাবে। তখন চালক-যাত্রীর কেউই বাঁচবে না।”
জনগণের দুর্ভোগ
ভাঙা সড়কে গাড়ি চালাতে গিয়ে প্রতিদিন ভোগান্তি পোহাচ্ছেন চালক ও যাত্রীরা। যানজট বেড়ে যাচ্ছে, আবার গাড়ির যন্ত্রাংশ দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে রিকশা, অটোরিকশা ও ছোট গাড়ির চালকদের জন্য বিষয়টি আরও দুর্ভোগের।
করপোরেশনের দাবি ও বাস্তবতা
চসিকের প্রধান প্রকৌশলী আনিসুর রহমান বলেন, “বিটুমিনের সবচেয়ে বড় শত্রু পানি। বৃষ্টিতে পানি জমে রাস্তায় ফাটল ধরে, আর ভারী মালবাহী গাড়ির কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। এটাই মূল কারণ।” তবে তিনি সংস্কারের গুণগত মান খারাপ বা নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
অন্যদিকে, চসিক দাবি করেছে তাদের নিজস্ব তহবিল ও চলমান প্রকল্পের মাধ্যমে রাস্তা সংস্কার করা হচ্ছে। বর্তমানে ৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি বড় প্রকল্পের কাজ চলছে। এর আগেও একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে। কিন্তু এতসব প্রকল্পের পরও কেন রাস্তাঘাট টেকসই হচ্ছে না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।