ইসরায়েলি বন্ডে আর বিনিয়োগ নয়—ঘোষণা দিলেন

নিউইয়র্ক সিটির মেয়র পদে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রার্থী জোহরান মামদানি সম্প্রতি এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট করেছেন, তিনি মনে করেন শহরের পেনশন তহবিলের অর্থ ইসরায়েলি বন্ডে বিনিয়োগ করা উচিত নয়। কারণ, তাঁর মতে ইসরায়েল আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গ করছে এবং নিউইয়র্ক সিটির সম্পদ কোনোভাবেই সেই প্রক্রিয়ায় জড়িত থাকা উচিত নয়।

গত সপ্তাহে সিবিএস নিউইয়র্কের সাংবাদিক মারসিয়া ক্রেমারের সঙ্গে আলাপচারিতায় মামদানি এই বক্তব্য দেন। ক্রেমার তাঁকে সরাসরি প্রশ্ন করেন, মেয়র হলে তিনি কি পেনশন তহবিলের কর্তৃপক্ষকে ইসরায়েলের সঙ্গে ব্যবসা করা প্রতিষ্ঠান বা ইসরায়েলি বন্ড থেকে বিনিয়োগ সরাতে বলবেন? জবাবে মামদানি বলেন, “আমি মনে করি, আন্তর্জাতিক আইনভঙ্গের কাজে আমাদের কোনো তহবিলের জড়িত থাকা উচিত নয়।” তিনি আরও জানান, বর্তমান সিটি কম্পট্রোলার ব্র্যাড ল্যান্ডার এ বিষয়ে সঠিক পদক্ষেপ নিয়েছেন।

২০২৩ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর ল্যান্ডার সিদ্ধান্ত নেন, পুরোনো ইসরায়েলি বন্ডগুলোর মেয়াদ পূর্ণ হলে আর নতুন কোনো বন্ড কেনা হবে না। যুক্তি হিসেবে তিনি বলেন, শহরের নীতি অনুযায়ী বিদেশি সরকারের ঋণে বিনিয়োগ এড়িয়ে চলা উচিত এবং ইসরায়েলকে বিশেষ সুবিধা দেওয়াও অনুচিত। এর ফলে প্রায় ৫০ বছর ধরে চলা নিউইয়র্ক সিটির ইসরায়েলি বন্ড বিনিয়োগ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। তবে এই সিদ্ধান্ত ঘিরে তীব্র বিতর্ক দেখা দেয়। সমালোচকেরা অভিযোগ করেন, ল্যান্ডার ফিলিস্তিনপন্থী আন্দোলন, বিশেষ করে বিডিএস আন্দোলনের কাছে নতি স্বীকার করেছেন। কিন্তু ল্যান্ডার জোর দিয়ে জানান, তাঁর সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক নয়, বরং নীতিগত।

বর্তমানে নিউইয়র্ক সিটির পেনশন তহবিলের প্রায় ৩১৫ মিলিয়ন ডলার ইসরায়েলি কোম্পানি ও রিয়েল এস্টেটে বিনিয়োগ রয়েছে। অন্যদিকে নিউইয়র্ক স্টেট কমন রিটায়ারমেন্ট ফান্ডেও ৩৫২ মিলিয়ন ডলারের বেশি ইসরায়েলি বন্ড ছিল। পাঁচটি পৃথক তহবিল নিয়ে গঠিত নিউইয়র্ক সিটির পেনশন ফান্ডের মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৮৯ বিলিয়ন ডলার, যা তত্ত্বাবধান করেন সিটির কম্পট্রোলার।

সাক্ষাৎকারে মামদানিকে আরও জিজ্ঞাসা করা হয়, ইসরায়েলের সঙ্গে ব্যবসা করা অন্যান্য প্রতিষ্ঠান থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহার নিয়ে তাঁর অবস্থান কী। তিনি সরাসরি উত্তর না দিয়ে বলেন, আগে চিহ্নিত করা জরুরি কোথায় শহরের সম্পৃক্ততা সবচেয়ে স্পষ্ট। তাঁর মতে, পেনশন তহবিলে ইসরায়েলি বন্ড কেনা আসলে শহরের মূল্যবোধের প্রকাশ। আর নিউইয়র্কের মূল্যবোধ আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার সঙ্গেই থাকা উচিত।

এর আগে জুলাই মাসে মামদানি আলোচনায় আসেন যখন তিনি সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্সের সঙ্গে ব্রুকলিন কলেজে এক টাউন হলে যোগ দেন। সেখানে প্রায় ১,৭০০ মানুষ উপস্থিত ছিলেন। স্যান্ডার্সের “ফাইটিং অলিগার্কি” প্রচারণার অংশ হিসেবে অনুষ্ঠিত ওই সভায় করপোরেট আধিপত্য ও ধনকুবেরদের প্রভাব মোকাবিলা করে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা সাধারণ মানুষের হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। এ সভায় মামদানি আবারও তাঁর আগের অবস্থানে ফিরে আসেন এবং ফিলিস্তিনপন্থী মত প্রকাশ করায় চারজন অধ্যাপককে সিটি ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক থেকে বরখাস্ত করার সমালোচনা করেন।

সম্প্রতি নিউইয়র্কের গভর্নর ক্যাথি হোকৌও মামদানির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। তবে তাঁর ইসরায়েলবিরোধী অবস্থান নিয়ে বিতর্ক থামেনি। তিনি আরও বলেছেন, প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবেন। এমনকি তিনি ঘোষণা দেন, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিউইয়র্ক এলে তাঁকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে গ্রেপ্তার করতে পুলিশকে নির্দেশ দেবেন।

সব মিলিয়ে, নিউইয়র্কের আসন্ন মেয়র নির্বাচনে মামদানি তাঁর অবস্থান দিয়ে স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছেন যে শহরের নীতিনির্ধারণ আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত। পেনশন তহবিলের বিনিয়োগ থেকে শুরু করে বৈদেশিক নীতি-সংলগ্ন বিষয়গুলোতেও তিনি মূল্যবোধকে অগ্রাধিকার দেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন। এর ফলে তাঁর অবস্থান একদিকে সমর্থন পাচ্ছে মানবাধিকারপন্থী মহল থেকে, অন্যদিকে বিরোধিতার মুখে পড়ছে ইসরায়েলপন্থী ও মধ্যপন্থী রাজনীতিকদের কাছ থেকে।

Share With Your Friends

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *