সাইকেলে ১৭ হাজার কিলোমিটার পথ পেরিয়ে তাঁরা পৌঁছালেন মেসিদের কাছে

১৯৭৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘এপার ওপার’ নামে একটি বাংলা সিনেমা আছে। সেখানে বিখ্যাত একটি গানের প্রথম লাইনটি এমন ‘ভালোবাসার মূল্য কত…।’

মিগুয়েল সিলিও, ইয়ামান্দু মার্তিনেজ ও ভিসেন্তে কনকুলিনির এই সিনেমা দেখার কথা নয়, তবে বিশ্বকাপের এই মৌসুমে প্রিয় দলের জন্য তাঁরা যা করেছেন, সেটা ওই সিনেমার নাম ও গানের লাইনের মতোই। তিনজনই আর্জেন্টাইন, তাঁদের পছন্দের দলের নাম তাই না বললেও চলে। বিশ্বকাপে লিওনেল মেসিদের খেলা দেখতে তাঁরা আটলান্টিকের এপার থেকে পাড়ি দিয়েছেন ওপারে। আর এই ভালোবাসার মূল্য?
সাইকেলে পেরিয়েছেন ১৭ হাজার কিলোমিটার পথ। সময় লেগেছে সাড়ে ৯ মাস। ভ্রমণ করতে হয়েছে ১৭টি দেশ! সবই আর্জেন্টিনার খেলা দেখার জন্য।

সিলিওর বয়স ৫৬ বছর, মার্তিনেজের ৪৯ আর কনকুলিনির ২৯ বছর। এর মধ্যে মার্তিনেজ ও সিলিওর যা বয়স, তাতে হাজার হাজার কিলোমিটার পথ সাইকেলে পাড়ি দেওয়া বিস্ময়করই, কিন্তু ফুটবল তো এমনই। ভালোবাসার বশে মানুষ অবিশ্বাস্য সব কাজ করে বসেন।

সিলিওদের ভালোবাসার এই বিশ্বকাপ অভিযানের শুরুটা আর্জেন্টিনার এনত্রে রিওস প্রদেশের গুয়ালেগুয়াইচু শহর থেকে, আর সমাপ্তি যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস সিটিতে পা রাখার মাধ্যমে। আর্জেন্টিনা দল তাদের বিশ্বকাপের তাঁবু খাটিয়েছে এই কানসাসেই। মেসিরা শহরটিতে পা রাখার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই সেখানে পৌঁছান সিলিওরা।

আর্জেন্টিনা দলে তারকার অভাব নেই, কিন্তু সিলিও-মার্তিনেজ-কনকুলিনি সেখানে পৌঁছানোর পর যেন তাঁদের চেয়েও বড় তারকা বনে যান! রীতিমতো ‘রকস্টার।’ প্রীতি ও সৌহার্দ্যের উষ্ণতা ছড়িয়ে এ তিন ভক্তকে বুকে টেনে নেয় লিওনেল স্কালোনির দল।
@enbiciandoalmundo-নামে ইনস্টাগ্রামে তাঁদের একটি হ্যান্ডল রয়েছে। সেখানে তাঁদের এই অভিযাত্রার খুঁটিনাটি নথিভুক্ত করা হয়। এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশের গন্তব্যে পৌঁছানোটা তাঁদের কাছে ট্যুর ডি ফ্রান্সের বিখ্যাত ‘হলুদ জার্সি’ গায়ে জড়ানোর মতোই এক পরম পাওয়া।

আর্জেন্টাইন দলের কাছে পৌঁছানোর আগে টেক্সাসে (ডান থেকে) মার্তিনেজ, সিলিও ও কনকুলিনি

তবে সিলিওর এসবে অভ্যাস আছে। ২০১৮ বিশ্বকাপ দেখতে রাশিয়ায় আর ২০২২ বিশ্বকাপ দেখতে কাতারেও তিনি দুই চাকার বাহনে চেপে গিয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বকাপেও সাইকেল চেপে দেখতে যাওয়ার পরিকল্পনা হয় সাড়ে তিন বছর আগে। সে অনুসারে তাঁদের যাত্রা শুরু হয় গত বছরের ১৬ আগস্ট। তখনো তাঁরা তিনজন জানতেন না, আর্জেন্টিনা দল কোথায়, কার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচ খেলবে। পরে ডিসেম্বরে নিশ্চিত হয় আর্জেন্টিনার প্রথম ম্যাচ কানসাসে (আলজেরিয়ার বিপক্ষে)।

আর্জেন্টিনা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের এই অভিযাত্রার ‘মাস্টারমাইন্ড’ সিলিও সংবাদমাধ্যম ক্লারিনকে বলেন, ‘গত আগস্টে রওনা হওয়ার কারণ ছিল যেন প্রয়োজন হলে কানাডার ভ্যাঙ্কুভার পর্যন্ত যেতে পর্যাপ্ত সময় হাতে থাকে। পরে যখন ঘোষণা করা হলো কানসাস সিটিতে আর্জেন্টিনা ম্যাচ খেলবে, তখন বাড়তি সময়টুকু আমরা যুক্তরাষ্ট্রে উপভোগ করেছি। কোনো তাড়া না রেখে ঘুরে বেড়িয়েছি। অবশেষে আমরা এখানে পৌঁছাতে পেরেছি এবং আমরা ভীষণ খুশি।’

সাইকেল নিয়ে তাঁদের এই অভিযাত্রা কিন্তু মোটেও মসৃণ ছিল না। ইকুয়েডরে একটি কারাগারে দাঙ্গায় সাধারণ মানুষ নিহত হওয়ার ঘটনায় তাঁদের বাধ্য হয়ে যাত্রা থামিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে হয়েছিল। কলম্বিয়ায় যাওয়ার পর তাঁদের চলার পথেই একটি গাড়িতে বোমা বিস্ফোরণ ঘটে। সে সময় জীবন বাঁচাতে অবরুদ্ধ থাকতে হয় একটি হোটেলে।

তবে কষ্ট না করলে তো কেষ্ট মেলে না। এই অভিযাত্রায় তাঁদের মনের মুকুরে এমন সব স্মৃতি যোগ হয়েছে, যা কখনোই ভোলার নয়। ভিসেন্তে কনকুলিনি সে স্মৃতির ঝাঁপি খুলে বলেন, ‘দুই-তিন সপ্তাহ আগে বাস্কেটবল কোর্টে (আর্জেন্টাইন) কিংবদন্তি মানু জিনোবিলির সঙ্গে আমাদের দেখা হয়। আমরা আগেই তাঁকে (সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে) বার্তা পাঠিয়েছিলাম এবং তিনিও সাড়া দেন। পরে তিনি ও তাঁর মায়ের সঙ্গে বসে প্রায় দুই-তিন ঘণ্টা ধরে কফি খেতে খেতে জমিয়ে আড্ডা দিয়েছি।’

মেসিদের অনুশীলন ক্যাম্পে পৌঁছানোর আগেই কৌতুক করে ক্লারিনকে ইয়ামান্দু বলেন, ‘আমরা জানি মেসি আমাদের জন্য মাতে (আর্জেন্টাইন চা-জাতীয় পানীয়) বানাতে ওভেন ইতিমধ্যেই গরম করছেন!’

আর্জেন্টিনার ক্যাম্পে পৌঁছানোর পর কোচ লিওনেল স্কালোনির সঙ্গে তাঁরা

পাশ থেকে মিগুয়েল ফোঁড়ন কাটেন, ‘মেসির কাছে ক্ষমা চেয়েই বলছি, আমরাই এবার তাঁকে মাতে বানানো শেখাব। উনি ফুটবল মাঠে সেরা খেলোয়াড় হতে পারেন, কিন্তু কীভাবে চমৎকার মাতে বানাতে হয়, সেই পাঠ আমাদের মতো এনত্রে রিওসের বাসিন্দাদের কাছ থেকেই শিখতে হবে।’

সিলিওর জীবনদর্শন একটু ভিন্ন। তাঁর চোখে স্বল্প আয়ুর এই জীবন আসলে উপভোগের, ‘আমি প্রায়ই এই বিষয় নিয়ে ভাবি। ২৫ বছর ধরে আমি সাইকেলে চেপে এভাবে দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়াচ্ছি। আসলে জীবনের নশ্বরতা বা শেষ পরিণতি সম্পর্কে আমি ভীষণভাবে সচেতন। আমি জানি মানুষের জীবনে সময় সীমিত, বয়সের সঙ্গে সুস্বাস্থ্যও একদিন হারিয়ে যায়। তাই যত দিন শরীরে কুলায়, জীবনটাকে উপভোগ করা এবং নিজের স্বপ্নগুলোকে সত্যি করাই আসল কথা।’

কানসাস সিটিতে পৌঁছানোর পর আর্জেন্টিনার এই তিন ভক্তকে বরণ করে নেন কোচ লিওনেল স্কালোনি ও এএফএ সভাপতি ক্লদিও তাপিয়া। তিন ভক্তের সেই ইনস্টাগ্রাম প্রোফাইল ট্যাগ করে তাপিয়া নিজের হ্যান্ডলে লেখেন, ‘আর্জেন্টাইন ভক্তরা এই জার্সি ও সর্বোপরি জাতীয় দলের জন্য যে উন্মাদনা আর আবেগ মনে ধারণ করেন, তার কোনো সীমা নেই, তা কোনো সীমানা মানে না, আর এটা এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলো।’

Share With Your Friends

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *