যুদ্ধ বন্ধে ইউক্রেনকে ক্রিমিয়ার আশা ছাড়তে হবে, ন্যাটোতে যোগ দিতে পারবে না: ট্রাম্প

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক বিস্ময়কর প্রস্তাব দিয়েছেন ইউক্রেনকে। তিনি বলেছেন, চাইলে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি রাশিয়ার সঙ্গে চলমান যুদ্ধ তাৎক্ষণিকভাবে থামাতে পারেন। তবে এর বিনিময়ে তাঁকে কিছু কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ক্রিমিয়ার মালিকানা পুনরুদ্ধারের আশা ত্যাগ করা এবং ভবিষ্যতে ন্যাটোতে যোগ না দেওয়া। ট্রাম্পের দাবি, এই শর্তগুলো মেনে নিলেই স্থায়ী শান্তিচুক্তি সম্ভব হবে।

গত রোববার রাতে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লিখেছেন, “ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি চাইলে যুদ্ধ থামাতে পারেন, অথবা চাইলে লড়াই চালিয়ে যেতে পারেন। মনে রাখবেন, ক্রিমিয়া চলে গিয়েছিল ওবামার আমলে—একটিও গুলি ছোড়া হয়নি! আর ইউক্রেনের ন্যাটোতে যোগদান? সেটা কখনোই হবে না। কিছু বিষয় বদলায় না।”

২০১৪ সালে ইউক্রেন থেকে ক্রিমিয়া দখল করে নেয় রাশিয়া। এরপর থেকেই ইউক্রেন ও রাশিয়ার সম্পর্ক টানাপোড়েনে জড়ায়, যা ২০২২ সালে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের রূপ নেয়। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা মিত্ররা এ যুদ্ধ থামাতে নানা চেষ্টা চালালেও এখনো কার্যকর কোনো সমাধান মেলেনি।

ট্রাম্পের এই মন্তব্য আসে এমন সময়ে, যখন তিনি হোয়াইট হাউসে জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন। এর আগে গত শুক্রবার আলাস্কায় রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে এক বৈঠকে অংশ নেন ট্রাম্প। সেখানে তিনি সাময়িক যুদ্ধবিরতির দাবি থেকে সরে এসে স্থায়ী শান্তিচুক্তির আহ্বান জানান। ফলে জেলেনস্কির সঙ্গে আসন্ন বৈঠকে ট্রাম্প একই বার্তা দিতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

রোববার রাতে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি। আজ সোমবার হোয়াইট হাউসে বসবে বহুল আলোচিত এই বৈঠক। চলতি বছরের শুরুর দিকে ওয়াশিংটনে দুই নেতার মধ্যে তীব্র বাগ্‌বিতণ্ডার পর এটিই তাঁদের প্রথম সাক্ষাৎ। তবে এবার জেলেনস্কি একা নন, তাঁর সঙ্গে থাকছেন ইউরোপীয় মিত্ররাও।

ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটে, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ, ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি, জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস, ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার স্টাব এবং ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েনও ওয়াশিংটনে আলোচনায় অংশ নেবেন। তবে এদের সবাই হোয়াইট হাউস বৈঠকে থাকবেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত হয়নি।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ট্রাম্প কিছু নির্দিষ্ট শর্ত মানতে জেলেনস্কিকে চাপ দিতে পারেন। তবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এসব গুঞ্জন উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, জেলেনস্কিকে শান্তিচুক্তি মানতে বাধ্য করবেন—এমন ধারণা আসলে ‘মিডিয়ার গল্প’ ছাড়া কিছু নয়।

এদিকে ন্যাটো নেতারাও চাইছেন, ফেব্রুয়ারিতে ওভাল অফিসে হওয়া উত্তপ্ত পরিস্থিতি যেন পুনরায় না ঘটে। সেবার ট্রাম্প ও মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সের সঙ্গে জেলেনস্কির তর্কাতর্কি পুরো বৈঠক ভণ্ডুল করে দিয়েছিল। সেই ঘটনার পর থেকেই ওয়াশিংটন ও কিয়েভের সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়।

এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইউক্রেন সম্পর্ক ঘিরে আরও কিছু অগ্রগতি হয়েছে। গত এপ্রিল মাসে দুই দেশ একটি খনিজসম্পদ চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। এর আগে ভ্যাটিকানে পোপ ফ্রান্সিসের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সময় ট্রাম্প ও জেলেনস্কি ব্যক্তিগত বৈঠক করেন, যেখানে ইউক্রেন স্পষ্ট জানায় যে তারা মার্কিন অস্ত্রের জন্য অর্থ প্রদান করতেও প্রস্তুত। গত জুলাইয়ে দুই নেতার মধ্যে টেলিফোন আলাপও হয়, যা জেলেনস্কি বর্ণনা করেছিলেন “এটাই আমাদের মধ্যে হওয়া সেরা আলাপ।”

সব মিলিয়ে, আজকের বৈঠক শুধু যুক্তরাষ্ট্র-ইউক্রেন সম্পর্কের জন্যই নয়, গোটা ইউরোপীয় নিরাপত্তার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্পের প্রস্তাব অনুযায়ী ক্রিমিয়া ও ন্যাটো ইস্যুতে ছাড় দিতে জেলেনস্কি রাজি হবেন কি না, সেটিই এখন বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

Share With Your Friends

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *