মোদির পর চীনে পুতিন, এসসিও সম্মেলন এবার কেন ভিন্ন

চীনের উত্তরাঞ্চলীয় বন্দরনগরী তিয়ানজিনে আজ রোববার শুরু হয়েছে সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও) সম্মেলন। দুই দিনের এ সম্মেলনে যোগ দিতে ইতোমধ্যেই পৌঁছেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের আমন্ত্রণে আয়োজিত এই বৈঠকে প্রায় ২০টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান অংশ নিচ্ছেন।

২০০১ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এটাই এসসিওর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সম্মেলন হতে যাচ্ছে, যেখানে সদস্য রাষ্ট্র ছাড়াও পর্যবেক্ষক ও সংলাপ সহযোগী দেশগুলোর প্রতিনিধিরাও উপস্থিত থাকবেন। বর্তমানে এসসিওর সদস্য দেশ হলো চীন, ভারত, রাশিয়া, পাকিস্তান, ইরান, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান ও বেলারুশ। এর বাইরে আরও ১৬টি দেশ পর্যবেক্ষক বা সহযোগী হিসেবে যুক্ত রয়েছে।

পুতিনের কূটনৈতিক দৌড়ঝাঁপ

আজ সকালে তিয়ানজিনে পৌঁছে পুতিনকে ঘিরে চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলো ব্যাপক প্রচারণা চালিয়েছে। চীন ও রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরেই এসসিওকে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর বিকল্প শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করে আসছে। পুতিনও এসসিওকে তার বৈদেশিক নীতির একটি বড় হাতিয়ার হিসেবে দেখছেন।

গতকাল শনিবার চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়ায় প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে পুতিন বলেন, এসসিও সম্মেলন সমসাময়িক বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং অভিন্ন ইউরেশীয় অঞ্চলে সংহতি জোরদার করতে সহায়তা করবে। তাঁর ভাষায়, “এসব উদ্যোগই একটি অধিক ন্যায়সংগত বহুপক্ষীয় বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন ও তাইওয়ান ইস্যুতে চীনের কড়াকড়ির কারণে পশ্চিমা বিশ্ব চীন ও রাশিয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। ফলে বেইজিং ও মস্কো নিজেদের প্রভাব বিস্তারের বিকল্প মঞ্চ হিসেবে এসসিওকে ব্যবহার করছে। জাপানের সোকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লিম তাই ওয়েই বলেন, “পুতিনের জন্য এখন বিশ্বমঞ্চে এসসিওর সব সুযোগ–সুবিধা দরকার। একই সঙ্গে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির সমর্থনও তাঁর কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”

ভারতের জন্য নতুন সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ

এই সম্মেলনে ভারতের অংশগ্রহণও নজর কাড়ছে। জাপান সফর শেষে শনিবার সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তিয়ানজিনে পৌঁছান। এটি ২০১৮ সালের পর তাঁর প্রথম চীন সফর। দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত বিরোধ ও কূটনৈতিক শীতলতা সত্ত্বেও এই সফরকে ইতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

গত বছর অক্টোবরে রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে মোদি ও সি চিন পিংয়ের মুখোমুখি সাক্ষাৎ হয়েছিল। পাঁচ বছরের মধ্যে যা ছিল দুই দেশের নেতাদের প্রথম সরাসরি বৈঠক। ওই বৈঠকের পর থেকেই দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কে কিছুটা উষ্ণতা ফিরে আসে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি ভারতীয় পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর করেছে। এর মধ্যে ২৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপ করা হয়েছে এবং রাশিয়ার কাছ থেকে তেল আমদানির কারণে অতিরিক্ত আরও ২৫ শতাংশ শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ করেছে ওয়াশিংটন। এমন পরিস্থিতিতে ভারতের জন্য রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার কৌশল নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।

চীনের কূটনৈতিক অগ্রযাত্রা

এসসিও সম্মেলন আয়োজনের মাধ্যমে চীন অপশ্চিমা বিশ্বে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সিঙ্গাপুরের নানইয়াং প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ডিলান লোহ বলেন, “চীন দীর্ঘদিন ধরে এসসিওকে একধরনের অপশ্চিমা শক্তি জোট হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইছে, যা নতুন ধরনের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এগিয়ে নেবে।”

তিনি আরও বলেন, “সংক্ষেপে বলতে গেলে এটি চীন-প্রভাবিত বহুপক্ষীয় ব্যবস্থা, যা পশ্চিমা আধিপত্যশীল ব্যবস্থার বাইরে এক বিকল্প শক্তি কেন্দ্র তৈরি করতে চায়।”

এবারের সম্মেলনে মিসরের প্রধানমন্ত্রী মুস্তাফা মাদবুলি, কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী হুন মানেতসহ আরও অনেক দেশের নেতা অংশ নিচ্ছেন। সম্মেলনের ফাঁকেই বেশ কয়েকটি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক নির্ধারিত রয়েছে। আগামীকাল পুতিনের তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠকে ইউক্রেন যুদ্ধ ও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি মূল আলোচ্য বিষয় হিসেবে থাকবে।

পশ্চিমা বিশ্বের উদ্বেগ

বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমা বিশ্বের শুল্কনীতি ও নিষেধাজ্ঞার কারণে এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো নিজেদের মধ্যে নতুন জোট গঠনে আগ্রহী হয়ে উঠছে। এসসিওকে তাই শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোট নয়, বরং একটি বৈশ্বিক কূটনৈতিক শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।

চীন আগামী বুধবার রাজধানী বেইজিংয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির ৮০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বিশাল সামরিক কুচকাওয়াজের আয়োজন করেছে। এসসিও সম্মেলন শেষে পুতিন, মোদিসহ কয়েক দেশের নেতারা সেই অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে চীন ও রাশিয়ার কৌশলগত সম্পর্ক আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

Share With Your Friends

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *