বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস আজ আক্রান্ত প্রতি ১০ জনের সাতজনই কর্মক্ষম

দেশে অনুমিত ডায়াবেটিক রোগী এক কোটি ৩৯ লাখ। ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত প্রতি ১০ জনের সাতজনই কর্মক্ষম। এদের মধ্যে প্রতি চারজনে তিনজন উদ্বেগ, বিষণ্নতাসহ কোনো না কোনো মানসিক রোগে ভুগছে। আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশন (আইডিএফ) সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সংস্থাটির দেওয়া তথ্য মতে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ডায়াবেটিসের প্রবণতা বেশি—এমন দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। এই অঞ্চলে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্কদের (২০ থেকে ৭৯ বছর) মধ্যে বাংলাদেশ দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্থানে রয়েছে। এই ধারা বজায় থাকলে ২০৫০ সালে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা হবে দুই কোটি ৩১ লাখ।

এমন পরিস্থিতিতে আজ শুক্রবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস।দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য—‘কর্মস্থলে ডায়াবেটিস সচেতনতা গড়ে তুলুন’। দিবসটি উপলক্ষে বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতিসহ বিভিন্ন সংস্থা নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে।

দেশের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, বেশির ভাগ অফিস বা কর্মস্থলে ডায়াবেটিস সম্পর্কে সচেতনতা খুবই সীমিত। অনেক কর্মী তাঁদের রোগ গোপন করে রাখেন।কারণ বৈষম্য, চাকরি হারানোর ভয় বা সহকর্মীর ভুল ধারণা তাঁদের মানসিক চাপ আরো বাড়িয়ে তোলে। এতে রক্তে গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণ ব্যাহত হয় এবং দীর্ঘ মেয়দে জটিলতা বাড়ে। তাঁরা বলছেন, কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবান পরিবেশ গড়ে তোলা গেলে ডায়াবেটিস প্রতিরোধে বড় অগ্রগতি সম্ভব। প্রতিদিন  অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা বা ব্যায়াম, স্বাস্থ্যকর খাবার ও মানসিক প্রশান্তি কর্মজীবীদের জন্য অপরিহার্য। এ ছাড়া ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত পরিকল্পনা, সুলভ ওষুধ সরবরাহ এবং কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবান সংস্কৃতি গড়ে তোলার এখনই সময়।

দিবসটি উপলক্ষে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ‘ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে যেকোনো রোগী অন্যান্য মানুষের মতোই কর্মক্ষম ও স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারেন। কিন্তু ডায়াবেটিক রোগীরা প্রায়ই এ নিয়ে দুশ্চিন্তাসহ বিভিন্ন ধরনের মানসিক সমস্যায় ভোগেন। অনেকেই নিজেদের ডায়াবেটিস সংক্রান্ত সমস্যা অন্যদের কাছে গোপন রাখেন। কর্মস্থলে ডায়াবেটিস সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করা প্রয়োজন, যাতে যেকোনো ডায়াবেটিক রোগীর জন্য তার পারিপার্শ্বিক পরিবেশ উপযোগী হয়ে উঠতে পারে।’

বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ডা. এ কে আজাদ কর্মস্থল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক কার্যক্রমের পরিবেশ তৈরির আহবান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর মধ্যে ডায়াবেটিস প্রতিরোধে কর্মস্থলে নিয়মিত হাঁটা ও শরীরচর্চার সুযোগ সৃষ্টি করা জরুরি। আমাদের দেশে কর্মস্থলে শরীরচর্চার কোনো সুযোগ নেই। নিয়মিত ব্যায়াম, সুষম খাদ্যাভ্যাস ও সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রায় ৬৫ শতাংশ ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করা সম্ভব।’

ডায়াবেটিস কী : মানুষের শরীরে ইনসুলিন নামের এক ধরনের হরমোনের অভাব হলে রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ বেড়ে যায়। এই অবস্থাকেই ডায়াবেটিস বলা হয়। রোগটি সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য না। তবে নিয়ন্ত্রণে রেখে সুস্থ থাকা যায়। নিয়ন্ত্রণ না করলে কিডনি, চোখ, হৃৎপিণ্ড ও পা মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হয়। ডায়াবেটিস সাধারণত দুই ধরনের হয়—টাইপ-১ ও টাইপ-২। চিকিৎসকরা জানান, মূলত ৩০ বছরের কম বয়সীদের টাইপ-১ ডায়াবেটিস হয়। এ ধরনের রোগীর সংখ্যা দেশে কম। তবে টাইপ-২ ধরনের ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা এ দেশে বেশি।

বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি জানিয়েছে, বাংলাদেশে গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের হার ৬ থেকে ১৪ শতাংশ। অন্তঃসত্ত্বা নারীদের টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি—প্রায় ৫০ শতাংশ। গর্ভকালে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হলে শিশুদেরও আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৪৩.৫ শতাংশ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের রোগ নির্ণয় হচ্ছে না। এই সংস্থার যে চিত্র, এতে রোগটি বাংলাদেশে ঊর্ধ্বমুখী। ২০৩০ সালের মধ্যে রোগটি নিয়ন্ত্রণে পাঁচটি লক্ষ্য নির্ধারণ করছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। এগুলো হলো ৮০ শতাংশ রোগীর শনাক্তকরণ, ৮০ শতাংশ রোগীর রক্তের গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণ, ৮০ শতাংশ রোগীর রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, ৪০ বছর বয়সী ৬০ শতাংশ রোগীর স্ট্যানটিন গ্রহণ ও শতভাগ টাইপ-১ রোগীর জন্য সাশ্রয়ী ইনসুলিন ও গ্লুকোজ পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা।

কর্মস্থলে সচেতনতা জরুরি : হরমোন বিশেষজ্ঞদের সংগঠন বাংলাদেশ এন্ডোক্রাইন সোসাইটির তথ্য বলছে, দেশে প্রতি তিনজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির দুজন ডায়াবেটিস বা প্রি-ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। কর্মক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় বসে থাকা মানসিক চাপ, অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস ও ব্যায়ামের অভাব এই রোগ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। সংগঠনটির সভাপতি ডা. শাহজাদা সেলিম কালের কণ্ঠকে বলেন, গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের শহরে কর্মজীবী জনগোষ্ঠীর প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে ডায়াবেটিস বা প্রি-ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। তবু বেশির ভাগ কর্মস্থলে ডায়াবেটিস সম্পর্কে সচেতনতা খুবই সীমিত।

তিনি বলেন, ডায়াবেটিক রোগীর যত্ন শুধু হাসপাতাল বা ক্লিনিকের বিষয় নয়। এটি দৈনন্দিন জীবনযাপনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। একজন কর্মী যদি নিয়মিত খাবার খেতে না পারেন, ওষুধ গ্রহণ বা ইনসুলিন নিতে দেরি হয় কিংবা বিশ্রামের সুযোগ না পান, তাহলে তাঁর রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন। কর্মস্থলে যদি সমর্থনমূলক পরিবেশ থাকে—যেমন নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, স্বাস্থ্যকর খাবারের ব্যবস্থা, হাঁটার বিরতি ও কর্মীদের মানসিক সহায়তার ব্যবস্থা থাকলে শুধু কর্মী নয়, প্রতিষ্ঠানেরও দীর্ঘমেয়াদি লাভ হবে।

Share With Your Friends

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *