যোগাযোগবিচ্ছিন্ন দম বন্ধ হওয়া পাঁচ দিনের প্রবাসজীবন

গত দশ বছর পড়াশনা ও চাকরির সুবাদে দেশের বাইরে অবস্থান করছি। জাপান ঘুরে আমেরিকায়। বলতে গেলে প্রবাসের রংটা একই থাকে। দিন শুরু হলে কাজ, সন্ধ্যায় বাসায় ফেরা। আর এর মধ্যে চোখ লেগে থাকে বাংলাদেশে। কোথায় কী হচ্ছে, তাৎক্ষণিক খবর নিমেষেই অনলাইন সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে জানছি। মাতৃভূমি কেমন আছে, তা নিয়ে ভাবছি, লিখছি।

২০১৬ সালে হলি আর্টিজানের ঘটনার পর সম্ভবত সবচেয়ে উৎকণ্ঠাময় সময় পার করলাম আমরা। গত সপ্তাহের ছাত্র বিক্ষোভের ঘটনায় ইন্টারনেট দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া প্রিয় মাতৃভূমিকে ঠিক কতটা ভালোবাসি, তা ক্ষণে ক্ষণে আবার টের পেয়েছি।

গত বৃহস্পতিবার (১৮ জুলাই ২০২৪) যখন সকালে অফিসে গিয়েছি, তখন বাংলাদেশে রাত আটটা। ল্যাবে গিয়ে কিছুতেই মন বসাতে পারছিলাম না। মৃত্যু উপত্যকায় দাঁড়িয়ে আমার প্রিয় মাতৃভূমি।

সারা দিন একের পর এক প্রাণক্ষয়ের ছবি আর ভিডিও দেখার পর চোখ প্রতিনিয়ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও দেশের গণমাধ্যমের অনলাইনগুলোর ওপরই ছিল (বিশেষ করে প্রথম আলোয়)। কিন্তু হঠাৎ রাত নয়টার পর (যুক্তরাষ্ট্রের প্যাসিফিক সময় সকাল আটটা) পর দেশের গণমাধ্যমগুলো থেকে আপডেট দেওয়া বন্ধ হয়ে গেল।

প্রথম আলোর অনলাইন পেজে মৃত্যুর সংখ্যা ১৯, আগুনে বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) বন্ধ, এমন আপডেটের পর পত্রিকাটির অনলাইন সাইট যতবারই রিফ্রেশ দিই, কোনো আপডেট পাইনি। তাৎক্ষণিক দেশের অন্যান্য গণমাধ্যমের পেজগুলোয় ঢুঁ মারতে দেখা গেল, কানেকশন টাইমড আউট।

ইন্টারেনেটের গতি বা ট্রাফিক পর্যবেক্ষণ সাইট ক্লাউডফ্লায়ার ডটকমের তথ্যে জানলাম, দেশে বৃহস্পতিবার রাত পৌনে নয়টার পর থেকে বিশ্বের একমাত্র দেশ হিসেবে বাংলাদেশ তখন ইন্টারেনেটের বাইরে।

এমন এক ভুতুড়ে অভিজ্ঞতায় আমাদের মতো লাখো প্রবাসী বাংলাদেশি দেশের খবর জানার জন্য হন্য হয়ে গেলাম। একে অপরকে জিজ্ঞাসা করলাম, কেউ কোনো তথ্য পাচ্ছেন কি না। ইউটিউবের আপডেটগুলোও পুরোনো। ফলে বাংলাদেশে সেই মুহূর্তে কী ঘটছিল, তা জানার কোনো উপায় ছিল না।

দেশের সব কটি গণমাধ্যম বাইরের দুনিয়ায় ‘ব্লাকআউট’ থাকার কারণে আমার মতো প্রবাসীদের কাছে সময়টা যে অনেকটা কালরাত্রির শামিল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। দেশটাকে আমরা কতটা ভালোবাসি, তা মনে করিয়ে দিচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাজারো প্রবাসীর দেওয়া স্ট্যাটাসগুলো।

ইন্টারনেটের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় শুধু দেশের খবর থেকেই বঞ্চিত হইনি, প্রিয়জন ও পরিবারের সঙ্গেও যোগাযোগ করতে পারিনি আমরা। এমনকি আন্তর্জাতিক ফোনকলও এ সময় অনেকটা অচল ছিল। ফলে একেকটা দিন আমাদের কাছে হয়ে উঠেছিল ভয়ার্ত একেকটি রাত।

কোটা সংস্কারের দাবিতে বৃহস্পতিবার দিনের বেলায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলন সাংঘর্ষিক রূপ নেওয়ার পর যে রক্তপাত, বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীদের আর্তনাদ, পুলিশের মারমুখী অবস্থান, বিভিন্ন স্থাপনায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের প্রেক্ষাপটে আমাদের প্রবাসীদের মনে কেবলই শঙ্কা বেড়ে চলে। মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে, এমন শঙ্কাও ছিল।

বিশ্বের সঙ্গে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে আমার মতো হাজারো প্রবাসীর মনে বাংলাদেশকে ব্ল্যাকআউট করে রাখার যে কৌশল ক্ষমতাসীন সরকার নিয়েছিল, তা শুধু নিন্দনীয়ই নয়, মানবাধিকার লঙ্ঘনও। যদিও সরকার বলছে যে ডেটা সেন্টারে আন্দোলনকারীদের হামলার কারণে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়, কিন্তু পরিস্থিতি বিবেচনায় বিষয়টার সত্যতা কারও কাছে আসলে অস্পষ্ট নয়।

Share With Your Friends

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *