ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে ইসলামী ছাত্রশিবিরের আয়োজিত এক চিত্র প্রদর্শনীতে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিতদের ছবি তুলে ধরায় বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে সৃষ্টি হয়েছে চরম উত্তেজনা। মঙ্গলবার (৫ আগস্ট) সকালে শুরু হওয়া এই প্রদর্শনীতে যুদ্ধাপরাধীদের ‘বিচারিক হত্যাকাণ্ড’ বলে অভিহিত করে তাদের ছবি সংযুক্ত করায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বাম ছাত্র সংগঠনগুলো।
টিএসসির কেন্দ্রীয় এলাকায় আয়োজিত এ প্রদর্শনীতে স্থান পায় জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষস্থানীয় ছয় নেতার ছবি, যাদের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে। তারা হলেন: মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, আব্দুল কাদের মোল্লা, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, মীর কাসেম আলী ও সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী। এছাড়া আমৃত্যু কারাদণ্ড পাওয়া দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছবিও ছিল প্রদর্শনীতে। যদিও ৯০ বছরের দণ্ডপ্রাপ্ত গোলাম আযমের ছবি রাখা হয়নি।
শিবিরের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, এই নেতারা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার। আয়োজকরা এই প্রদর্শনীর শিরোনাম দেয় ‘বিচারিক হত্যাকাণ্ড’। সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি এস এম ফরহাদ বলেন, “আমরা একাত্তরের গৌরব অস্বীকার করছি না, তবে আমরা বিশ্বাস করি আওয়ামী লীগের আমলে বিচারব্যবস্থা দলীয়করণ হয়েছে। তাই এসব রায় আমরা মানি না।”
এই বক্তব্যের বিপরীতে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলো। তারা মনে করে, যুদ্ধাপরাধীদের এইভাবে গৌরবান্বিত করার চেষ্টা ইতিহাস বিকৃতির সামিল এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি অবমাননাকর।
বিকেলের দিকে সামাজিক মাধ্যমে বিষয়টি ছড়িয়ে পড়ার পর টিএসসিতে উপস্থিত হয় বাম ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা। তারা ছবিগুলো সরিয়ে ফেলার দাবি জানায়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সাইফুদ্দীন আহমেদসহ প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। পরে ছবিগুলো নামিয়ে ফেলা হয়।
ঘটনার পর বাম সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে প্রক্টরের কাছে চার দফা দাবি পেশ করা হয়:
- যুদ্ধাপরাধীদের ছবি তাৎক্ষণিকভাবে সরিয়ে নিয়ে প্রদর্শনী বন্ধ করতে হবে
- এমন ঘটনার জন্য ছাত্রশিবিরকে জনসম্মুখে ক্ষমা চাইতে হবে
- ভবিষ্যতে এ ধরনের আয়োজন যেন না হয় তার নিশ্চয়তা দিতে হবে
- বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কীভাবে এই ঘটনা ঘটতে দিল তা ব্যাখ্যা দিতে হবে এবং ক্ষমা চাইতে হবে
ঘটনার পর টিএসসির ভেতর-বাইরে পাল্টাপাল্টি স্লোগানে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এলাকা।
বাম সংগঠনগুলোর স্লোগান ছিল:
- “তুমিও জানো, আমিও জানি, শিবির মানেই পাকিস্তানি”
- “৭১ হারেনি, হেরে গেছে রাজাকার”
- “আমার মাটি, আমার মা – রাজাকারের হবে না”
অন্যদিকে, শিবিরের কর্মীরা পাল্টা স্লোগানে আওয়াজ তোলে:
- “সাঈদীর বাংলায়, শাহবাগীদের ঠাই নাই”
- “কাদের মোল্লার বাংলায়, শাহবাগীদের ঠাই নাই”
- “দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা”
অনেকেই মনে করছেন, এই প্রদর্শনীর মাধ্যমে শিবির মূলত সাম্প্রতিক গণজাগরণ ও তরুণদের ‘২৪ আন্দোলনের চেতনার’ বিপরীতে ‘৭১-এর খলনায়কদের’ সামনে এনে বিভাজন সৃষ্টির চেষ্টা করছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী নওরিন সুলতানা তমা বলেন, “শিবিরের এই আয়োজন ২৪ ও ৭১–কে মুখোমুখি দাঁড় করানোর চেষ্টা। এর মাধ্যমে তারা মুক্তিযুদ্ধকে অপমান করেছে। একজন ঢাবি শিক্ষার্থী হিসেবে আমি এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছি।”
শিবিরের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এই আয়োজন “জুলাই বিপ্লব” স্মরণে তাদের তিন দিনব্যাপী কর্মসূচির অংশ। প্রদর্শনী ছাড়াও থাকছে ডকুমেন্টারি প্রদর্শন, গান-কবিতা, শহীদ পরিবার ও আহতদের গল্প বলা, ‘৩৬ জুলাই এক্সপ্রেস’ ট্রেন মডেল ও প্রতীকী ‘ফতেহ গণভবন’ স্থাপন ইত্যাদি। আয়োজকরা বলছেন, “৩৬ জুলাই” একটি প্রতীকী দিন, যেখানে অতীত ও বর্তমানের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে মিলিয়ে নতুনভাবে বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তবে বিতর্কিত এই আয়োজন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে চলছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও চরম উত্তেজনা। ছাত্র ও শিক্ষক মহল বিষয়টিকে দেখছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধে স্পষ্ট এক চ্যালেঞ্জ হিসেবে। এখন দেখার বিষয়, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এই বিতর্কিত প্রদর্শনীর বিষয়ে কী অবস্থান নেয়।