চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) ক্যাম্পাসে রমজানের প্রথম দিনে এক ঐতিহাসিক গণইফতার অনুষ্ঠিত হয়েছে। মিনার নামের একটি সংগঠনের উদ্যোগে কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে দুই হাজারেরও বেশি ছাত্র-ছাত্রী একসঙ্গে ইফতার করেছেন। এই আয়োজনটি চবির ইতিহাসে একটি অনন্য ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে, এত বড় আয়োজনের পাশাপাশি কিছু সংকটও দেখা দিয়েছে, যা ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষণীয় হয়ে থাকবে।
মিনার সংগঠনের উদ্যোগে ২০ দিনব্যাপী ‘দারসুল কুরআন ও গণইফতার মাহফিল’-এর সূচনা হয় ২ মার্চ, রবিবার। এই আয়োজনের প্রথম দিনে আসর নামাজের পর ‘দারসুল কুরআন’ পর্বে ‘তাকওয়ার সামগ্রিক রূপরেখা’ বিষয়ে বক্তব্য দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের শিক্ষক ও মিনার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আ ক ম আব্দুল কাদের। তার বক্তব্যে তিনি রমজানের তাৎপর্য ও তাকওয়া অর্জনের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
মিনার সংগঠনের পক্ষ থেকে এই গণইফতারের আয়োজন করা হয়। সংগঠনের সহসভাপতি ও চবি ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি মোহাম্মদ আলী জানান, তাদের লক্ষ্য ছিল একটি সুসংগঠিত ও সুশৃঙ্খল ইফতার মাহফিলের আয়োজন করা। তবে, তাদের প্রত্যাশার চেয়েও বেশি মানুষ উপস্থিত হওয়ায় কিছু সংকট তৈরি হয়। তিনি বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ, প্রথমদিনের মতো আমরা আমাদের গণইফতার কার্যক্রম সম্পন্ন করতে পেরেছি। তবে, আমাদের লক্ষ্যের চেয়েও বেশি মানুষ উপস্থিত হয়েছেন। যার কারণে, আজ পর্যাপ্ত ইফতার ব্যবস্থা করতে পারিনি। এটার জন্য আমরা সবার কাছে দুঃখ প্রকাশ করছি। ইনশাআল্লাহ, আগামী দিনগুলোতে আমরা পর্যাপ্ত ইফতারের ব্যবস্থা রাখার চেষ্টা করব।’
ইফতারিতে ছোলা, মুড়ি, পিঁয়াজু, বেগুনি, আলুরচপ, খেজুর, শরবত এবং ফিরনির ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। ছাত্রীদের জন্য বেগম খালেদা জিয়া হলেও আলাদা ব্যবস্থা করা হয়, যেখানে প্রায় সাড়ে তিন শ ছাত্রী উপস্থিত ছিলেন।
যদিও আয়োজনটি প্রশংসনীয় ছিল, তবুও কিছু সংকট দেখা দেয়। অনেক ছাত্র-ছাত্রী সারাদিন রোজা পালনের পর ইফতারের সময় পর্যাপ্ত খাবার ও পানীয় পায়নি। মিনারের ভলান্টিয়াররাও নিজেরা ইফতার করতে পারেননি। এই সংকটের বিষয়ে মিনার ও চবি ছাত্রশিবিরের সভাপতি মোহাম্মদ ইব্রাহীম বলেন, ‘প্রথম দিনের দারসুল কুরআন ও গণ-ইফতার সম্পন্ন হয়েছে। অনাকাঙ্ক্ষিত ভুলসমূহ ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আপনাদের শৃঙ্খলা ও ধৈর্যশীলতা বিমোহিত করেছে। আগামীকাল থেকে আয়োজন বৃদ্ধির সর্বোচ্চ চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।’
শিক্ষার্থীদের প্রতিক্রিয়া: এই আয়োজন নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকেই মিনারের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। একজন শিক্ষার্থী বলেন, ‘চবির ইতিহাসে এত বড় আয়োজন আগে কখনো দেখিনি। এটি সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।’ তবে, কিছু শিক্ষার্থী সংকটের বিষয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন। একজন শিক্ষার্থী বলেন, ‘সারাদিন রোজা রাখার পর যখন ইফতারের সময় সামান্য পানিও পাইনি, তখন খুব খারাপ লেগেছে। তবে, মিনারের প্রতি আস্থা রেখেই আমরা গিয়েছিলাম। আশা করি, আগামী দিনগুলোতে তারা আরও সুসংগঠিতভাবে আয়োজন করবে।’
এই আয়োজন থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নেওয়া যায়। প্রথমত, এত বড় আয়োজনের জন্য প্রস্তুতি আরও পরিকল্পিত ও সুসংগঠিত হওয়া প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যা সঠিকভাবে অনুমান করা এবং সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। তৃতীয়ত, ভলান্টিয়ারদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা রাখা উচিত, যাতে তারা নিজেরাও ইফতার করতে পারেন।
মিনারের এই আয়োজন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে রমজানের একটি অনন্য উদ্যোগ হিসেবে ইতিহাসে স্থান পাবে। এটি শুধু একটি ইফতার মাহফিলই নয়, বরং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ঐক্যেরও একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তবে, প্রথম দিনের সংকটগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে আগামী দিনগুলোতে আরও সুসংগঠিত ও সুশৃঙ্খল আয়োজন করা গেলে এটি সত্যিই একটি আদর্শ উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হবে। মিনারের এই সাহসিকতা ও উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই এবং আশা করি, ভবিষ্যতেও তারা এমন মহৎ কাজে এগিয়ে আসবে।
এই আয়োজনটি শুধু চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়েই নয়, সারা বাংলাদেশের জন্য একটি অনুপ্রেরণাদায়ক ঘটনা। এটি প্রমাণ করে যে, সঠিক পরিকল্পনা ও ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার মাধ্যমে যে কোনো বড় আয়োজন সফলভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব। ইনশাআল্লাহ, আগামী দিনগুলোতে মিনারের এই আয়োজন আরও সুসংগঠিত ও সাফল্যমণ্ডিত হবে।
মোঃ রাফিকুল ইসলাম
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি