গাজার কান্না, মানবতার অপমান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবাদ ও বিশ্ব বিবেকের পরীক্ষা

দীর্ঘ সাত দশকের অধিক সময় ধরে চলমান ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাত আজ এক চরম নিষ্ঠুর বাস্তবতায় পৌঁছেছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে শুরু হয়ে চলতি ২০২৫ সাল পর্যন্ত গাজা উপত্যকা পরিণত হয়েছে এক নির্মম মৃত্যুপুরীতে। বিশ্ব ইতিহাসে বিরল এমন মানবিক বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে যখন বিশ্বশক্তি নির্বিকার, তখন বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও জনগণ প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের ১০ এপ্রিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয় এক বিরল প্রতিবাদ সমাবেশ ও বিশেষ দোয়া অনুষ্ঠান, যা নতুন প্রজন্মের বিবেককে নাড়া দেয়।

গাজা উপত্যকায় বর্তমানে যা ঘটছে, তা শুধু একটি যুদ্ধের পরিণাম নয়, এটি একটি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করার পরিকল্পিত অপচেষ্টা। জাতিসংঘের তথ্যমতে, ইসরাইলি হামলায় এ পর্যন্ত প্রায় ৪৫ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৬০ শতাংশই নারী ও শিশু। আহতের সংখ্যা ৭৫ হাজার ছাড়িয়েছে। গাজার হাসপাতালগুলো ধ্বংস, খাবার ও ওষুধের অভাব, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা—সব মিলিয়ে মানবিক বিপর্যয় চরমে পৌঁছেছে।

ইসরাইলি বোমাবর্ষণে ধ্বংস হয়েছে শত শত স্কুল, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, মসজিদ ও গির্জা। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা Amnesty International এবং Human Rights Watch এ ঘটনাগুলোকে গণহত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

গাজার এই বিপর্যয়ে সবচেয়ে বেশি প্রশ্নের মুখে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। বিশ্বজুড়ে মানবাধিকারের বুলি কপচানো এই শক্তিগুলো ফিলিস্তিন ইস্যুতে কার্যত ইসরাইলের পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র একাধিকবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে অস্ত্রবিরতির প্রস্তাবে ভেটো দিয়ে ইসরাইলি আগ্রাসনকে বৈধতা দিয়েছে। এ যেন “বিচারপতি নিজেই আসামির উকিল”।

ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা (OIC) এবং আরব লিগ মুখে নিন্দা জানালেও কার্যকর কোনো অবস্থান নেয়নি। বহু মুসলিম রাষ্ট্র নিজেদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের জন্য ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে ফেলেছে। এই নিষ্ক্রিয়তা ফিলিস্তিনি জনগণের উপর চাপিয়ে দিয়েছে চরম একাকীত্ব। আজ আরব বিশ্বের নিস্তব্ধতা বিশ্ব মুসলিম সমাজের ব্যর্থতার প্রতীক।

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয়ভাবে ফিলিস্তিনের পাশে অবস্থান নিয়েছে। ১৯৭৪ সালেই বাংলাদেশ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছিল এবং জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক ফোরামে তাদের অধিকারের পক্ষে সোচ্চার থেকেছে।

তবে দেশের জনগণ ও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যেও ফিলিস্তিনের প্রতি গভীর সংহতি ও সহমর্মিতা প্রকাশ পাচ্ছে। এমন সময়েই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবাদ কর্মসূচি নজির সৃষ্টি করেছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের উদ্যোগে ১০ এপ্রিল, ২০২৫ তারিখে বিশ্ববিদ্যালয় শহীদ মিনারে অনুষ্ঠিত হয় এক বিশাল বিক্ষোভ সমাবেশ ও দোয়া মাহফিল। এতে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, উপ-উপাচার্যগণ, বিভাগীয় শিক্ষকবৃন্দ ও শিক্ষার্থীরা। সমাবেশে বক্তারা ইসরাইলি আগ্রাসনের তীব্র নিন্দা জানান এবং পশ্চিমা বিশ্বের নির্লজ্জ নীরবতার কঠোর সমালোচনা করেন।

উপাচার্য প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইয়াহইয়া আখতার বলেন:

“শুধু দোয়া করলেই হবে না, আমাদের জ্ঞান-বিজ্ঞান ও ঐক্যের মাধ্যমে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।”

তিনি ফিলিস্তিনের জন্য মানবিক সহায়তার পাশাপাশি ইসরাইলি পণ্য বর্জনের আহ্বান জানান এবং মুসলিম বিশ্বের নিরবতায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) প্রফেসর ড. মোহাম্মদ শামীম উদ্দিন খান বলেন:

“ওআইসি যদি কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তবে এই সংগঠন ভেঙে দেওয়া উচিত। ফিলিস্তিনের পক্ষে ১৪৮টি রাষ্ট্র স্বীকৃতি দিলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি।”

তিনি আন্তর্জাতিক রাজনীতির চক্রান্তকে দায়ী করে মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর ঐক্যের উপর জোর দেন।

উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) প্রফেসর ড. মো. কামাল উদ্দিন বলেন:

“শিশুর মুখের দিকে তাকিয়ে কোনো নরপিশাচও এমন নৃশংসতা চালাতে পারে না। গাজায় যা হচ্ছে তা মানবতার লজ্জা।”

অনুষ্ঠানে উপস্থিত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা ফিলিস্তিনের পক্ষে অবস্থান নিতে একাত্মতা ঘোষণা করেন।

একটি শিক্ষিত জাতির মানবিক ভূমিকা

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এ উদ্যোগ দেখিয়ে দিয়েছে, শিক্ষিত সমাজ কখনোই মানবতাবিরোধী অন্যায়ের পাশে থাকতে পারে না। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা যদি সচেতন হন, তবে ভবিষ্যতে এমন বর্বরতার বিরুদ্ধে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশ আরও বলিষ্ঠ অবস্থান নিতে পারে।

ইসরাইলের আগ্রাসন, পশ্চিমাদের নীরবতা এবং মুসলিম বিশ্বের ব্যর্থতা আজ আমাদের সকলের বিবেককে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠান যখন প্রতিবাদে সোচ্চার হয়, তখন বোঝা যায়—মানবতা এখনো মরে যায়নি।

আমরা যদি সত্যিকারের মানুষ হতে চাই, তবে এখনই সময় ঐক্যবদ্ধ হওয়ার। মানবতা আজ রক্তাক্ত; এখন নীরব থাকলে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না।

Share With Your Friends

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *